সংস্কারে টানাপড়েন, জবাবদিহিতে ঘাটতি!

কাওসার আজম
Printed Edition
  • সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের কাছে মোট ১০,৭৩১ প্রশ্ন, উত্তর নেই ৩,৭১৬টির
  • ৩৯ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটিতেও নেতৃত্বে নেই বিরোধী দল
  • তিন অধিবেশনে ১১০ বিল পাস, পর্যালোচনা নিয়ে প্রশ্ন
  • সরকারের কিছু কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা পুরনো পথেই হাঁটছে : বদিউল আলম মজুমদার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের ভিত্তি তৈরি এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর সংসদীয় নজরদারি প্রতিষ্ঠা। কিন্তু প্রথম ছয় মাসেই সেই প্রত্যাশার সাথে বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েন, ৩৯টি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটির একটিরও সভাপতির পদ বিরোধী দলকে না দেয়া, হাজার হাজার প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া এবং সংস্কারসংশ্লিষ্ট আইন দ্রুততার সাথে পাসের ঘটনায় সংসদীয় জবাবদিহি ও সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে তিন অধিবেশনে ১১০টি বিল পাস, বাজেট অনুমোদন ও ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংসদের সক্রিয়তার চিত্রও পাওয়া গেছে। ফলে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে সক্রিয়তা ও জবাবদিহির ঘাটতি- দুই বিপরীত চিত্রই সামনে এসেছে। বিনাভোট, রাতের ভোট ও ‘ডামি’ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সংসদ শুরুতেই জাতীয় স্বার্থে ঐক্য, গঠনমূলক বিতর্ক, পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিল। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, সংসদ ব্যর্থ হলে পুরো বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জানিয়েছিলেন, সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করবেন এবং ভুল হলে বিরোধিতা করবেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমও সরকার ও বিরোধী দলের সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ এবং গঠনমূলক বিতর্কের প্রশংসা করেছিলেন। তবে তিন অধিবেশনের কার্যক্রমে সেই অঙ্গীকারের সাথে বাস্তবতার দূরত্ব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়েছে।

সংসদীয় নথি অনুযায়ী, প্রথম তিন অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের কাছে ১০ হাজার ৭৩১টি প্রশ্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৭১৬টির উত্তর পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে করা ৫১৫টি প্রশ্নের মধ্যে উত্তর দেয়া হয়েছে মাত্র ৮৫টির। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়নি। মন্ত্রীদের কাছে করা ১০ হাজার ২১৬টি প্রশ্নের মধ্যে ছয় হাজার ৯৩০টির উত্তর দেয়া হলেও ৩ হাজার ২৮৬টির জবাব মেলেনি। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অবশ্য সংসদ প্রথম ছয় মাসে সক্রিয় ছিল।

তিন অধিবেশনে মোট ১১০টি বিল পাস হয়েছে। দ্বিতীয় অধিবেশনে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন করা হয়। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন এবং আলোচনা চলে ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। তবে সংসদের কার্যকারিতা শুধু কতটি বিল পাস হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের সিদ্ধান্ত, অর্থ ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং জনস্বার্থের বিষয়ে নির্বাহী বিভাগকে কতটা জবাবদিহির মুখোমুখি করা যাচ্ছে- সেটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর।

গত ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠনের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা, তথ্য চাওয়া, কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কমিটি গঠন করলেই জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। কতটি বৈঠক হচ্ছে, কী বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ের জবাব কতটা যাচাই করা হচ্ছে, কী সুপারিশ করা হচ্ছে এবং সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না- এসবই কমিটির কার্যকারিতার মূল সূচক। এখানেই প্রথম বড় রাজনৈতিক টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠিত হলেও ৩৯টি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটির একটিরও সভাপতির পদ পায়নি বিরোধী দল।

সরকারি হিসাবসংক্রান্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত কমিটিসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটির সভাপতির পদে রয়েছেন সরকারি দলের সদস্যরা। জুলাই জাতীয় সনদে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ সংসদে আসনের অনুপাতে বিরোধী দলের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব রয়েছে। সংসদে বিরোধীদলের আসন প্রায় ২৬ শতাংশ হওয়ায় তাদের হিসাবে ৩৯টি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতির পদ পাওয়ার কথা। বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে তারা পেয়েছে মাত্র একটি সভাপতির পদ।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব শুধু সদস্য হিসেবে থাকলেই যথেষ্ট নয়; গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্বেও তাদের সুযোগ দিতে হবে। নবম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল থেকে দু’জন সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা এবং ভুলত্রুটি তুলে ধরে সংশোধনের দাবি জানানোই বিরোধী দলের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে সভাপতির পদেও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। তার দাবি, সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সাথে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেয়ার কোনো শর্ত বা সমঝোতা ছিল না। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও অভিযোগ করেছেন, কমিটি গঠনে বিরোধী দলের প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্ব যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

সরকার অবশ্য বলছে, বিরোধী দলকে কমিটির সভাপতির পদ দেয়ার বিষয়ে নীতিগত আপত্তি নেই। সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, আসনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ১০টি কমিটির সভাপতির পদ বিরোধীদলকে দেয়ার প্রস্তুতি সরকারের ছিল। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত কার্যক্রমে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অতীতের সংসদীয় চর্চায় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ছাড়া সাধারণত বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেয়া হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিরোধী দলের সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে। তবে সেটিকে সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোয় স্থায়ী রূপ দিতে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। এ জন্য গঠিত সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য আসন রাখা হয়েছে। তিনি বলেছেন, জুলাই সনদের সুবিধা দাবি করার পাশাপাশি সেটি বাস্তবায়নের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অংশ না নেয়া পরস্পরবিরোধী। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম সদস্য ও সুজনের প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের ছয় মাস সময় চলে গেছে এবং এরইমধ্যে সংসদের তিনটি অধিবেশন শেষ হয়েছে। সংসদীয় কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন ও কার্যক্রমও এগিয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারের এই ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তারা যে প্রত্যাশা ও অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তার সাথে বাস্তব কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, এই সরকার একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের মধ্যে তাদের নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল। তারা অনেক অঙ্গীকারও করেছিল। বিশেষ করে জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের দলীয়করণ ও স্বৈরাচারী প্রবণতা থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বের করে আনার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকার চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশও তারা অনুমোদন করেনি। সে সময় বলা হয়েছিল, পরবর্তীতে আরো ভালো আইন প্রণয়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা সেই পথেও এগোচ্ছে না। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সরকার ইতিবাচক ফল দেখাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের কিছু কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে তারা পুরনো পথেই হাঁটছে। তাদের অনেক সিদ্ধান্ত সংবিধান, আইন কিংবা আদালতের নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে তাদের একদফা কর্মসূচি ও নির্বাচনী অঙ্গীকারও কোনোভাবেই সরকারের সফলতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। সংসদীয় কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করেছে এবং সনদের বিধান অক্ষরে অক্ষরে পালন করার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও ঝুলে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে সরকার এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

কমিটির নেতৃত্বের বিরোধের পাশাপাশি সংস্কারসংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়ন নিয়েও টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ ছিল। প্রথম অধিবেশনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি। ফলে সেগুলো কার্যকারিতা হারায়। আরো সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল হয়। সরকার তখন বলেছিল, বাদ পড়া বিষয়গুলো নিয়ে পরে আরো শক্তিশালী আইন করা হবে। কিন্তু তৃতীয় অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত নতুন দু’টি আইন পাসকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধী দলের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন আইনে কমিশনের ক্ষমতা কমানো হয়েছে। প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বিল দু’টি পাসের কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। সরকার অবশ্য দাবি করেছে, আগের চেয়ে শক্তিশালী করেই আইন দু’টি করা হয়েছে। গুমসংক্রান্ত অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের যে ভূমিকা ছিল, নতুন আইনে তদন্তের দায়িত্ব শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দেয়া হয়েছে। তবে কোনো বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে সেই অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না- এমন বিধানও রাখা হয়েছে। র‌্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি গঠনের বিল নিয়েও বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধী দলের অভিযোগ, নাম পরিবর্তন হলেও র‌্যাবের জনবল, সম্পদ, ক্ষমতা ও কাঠামো নতুন বাহিনীতে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্কারের পাশাপাশি আইন প্রণয়নের পদ্ধতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তৃতীয় অধিবেশনের ৯ কার্যদিবসে ছয়টি বিল পাস করা হয়। কোনো কোনো বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই দিন সময় দেয়া হয়। বিরোধী দলের দাবির পর এসআরবি বিলের ক্ষেত্রে চার দিন সময় দেয়া হলেও কমিটি একটি বৈঠকেই বিলটি পরীক্ষা করে। কোনো কোনো বিল বিধি অনুযায়ী সংসদে উত্থাপনের তিন দিন আগে সদস্যদের হাতে পৌঁছেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও বিল আগেভাগে সংসদ সদস্যদের হাতে দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এতে আইন প্রণয়নের মান ও সংসদীয় পর্যালোচনার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদীয় সংস্কৃতিতেও প্রথম ছয় মাসে অস্বস্তিকর কিছু ঘটনা ঘটেছে। তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই করেন। বক্তব্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পরও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। অধিবেশনের শেষদিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে সরকারি দলের সদস্যদের হট্টগোল নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ডেপুটি স্পিকার বলেন, কোনো সদস্যের বক্তব্যে বাধা দেয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে। তবে সংসদকে শুধু সঙ্ঘাতের জায়গা হিসেবেও দেখা যায় না। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঙ্কট, সারসঙ্কটসহ জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংসদে এসেছে। সরকার জ্বালানি সঙ্কটের জন্য অতীতের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। সারসঙ্কটে সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও বিরোধী দল কৃষকের কাছে সার না পৌঁছানোর বিষয়টি সামনে এনেছে। অর্থাৎ মতপার্থক্য থাকলেও জনস্বার্থের বিষয়ে বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে ত্রয়োদশ সংসদের সামনে বড় পরীক্ষা। এর সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, বিরোধী দলের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ সংসদীয় ব্যবস্থার কাঠামো জড়িত। সমঝোতা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক ও ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ছাড়া সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।