রমজানেও গাজায় যুদ্ধবিরতি মানছে না ইসরাইল

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইসরাইল গাজায় নতুন হামলায় দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং কয়েকজনকে আহত করেছে। পবিত্র রমজান মাসে চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে এসব হামলা চালানো হয়। চিকিৎসা সূত্র জানায়, মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে হামলার প্রকৃতি তাৎণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের।

খান ইউনুসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসির বির ১৯ এলাকায় ড্রোন হামলায় আরো একজন নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। আহতদের নাসের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে একটি স্কুলের কাছে ইসরাইলি গুলিতে আরো একজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গাজা সিটির পূর্বে জেইতুন এলাকায় অন্তত একটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তবে তাৎণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সাীরা জানিয়েছেন, উত্তর গাজার বিভিন্ন এলাকায় গোলাবর্ষণ ও গুলির শব্দ শোনা গেছে। বুরেইজ শরণার্থী ক্যাম্পের পূর্বাঞ্চলেও গোলাবর্ষণ হয়েছে।

মার্কিন সমর্থিত যুদ্ধবিরতি ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর রয়েছে। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইল এ পর্যন্ত শত শতবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এতে ৬১৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এক হাজার ৬৬৩ জন আহত হয়েছেন। গাজায় ইসরাইলের হামলায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। অবরুদ্ধ গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং পুরো জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব অনুযায়ী, গাজা ও পশ্চিম তীরকে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপন অবৈধ।

নিরাপত্তা পরিষদের সাথে বোর্ড অব পিস’র সহাবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রাশিয়ার : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাথে কিভাবে কাজ করবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাশিয়া। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে সম্মিলিত আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্প সেপ্টেম্বরে প্রথম এই বোর্ডের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শেষ করতে তার পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। পরে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার পরিধি বাড়িয়ে বিশ্বের অন্য দ্বন্দ্বগুলোও সামলানো যায়। ঐতিহ্যগতভাবে এসব প্রচেষ্টা জাতিসঙ্ঘই তত্ত্বাবধান করে আসছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই এই বোর্ডে যোগ দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের অপর সদস্য রাষ্ট্র রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এতে যোগ দেয়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কিরিল লগভিনোভ রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা তাসকে বলেন, “বোর্ড অব পিসের সনদ প্রায়শই অকার্যকর প্রমাণিত প্রক্রিয়াগুলোকে প্রতিস্থাপনের জন্য নকশা করা একটি নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছে।” রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভাগের পরিচালক লগভিনোভ জানান, এই বোর্ডের সনদে গাজার কোনো উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, “এটি পরিষ্কার যে, এই দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে বোর্ড অব পিস কিভাবে জাতিসঙ্ঘ ও এর নিরাপত্তা পরিষদের সাথে সহবস্থান করবে, যেটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত একমাত্র সংস্থা।” জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে এ পর্যন্ত বোর্ড অব পিসের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, রাশিয়ার এই পর্যবেণ পুনরুল্লেখ করেন তিনি। বোর্ডের সনদে বলা হয়েছে, এটি ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যাবলী’ গ্রহণ করবে। এর চেয়ারম্যান ট্রাম্প কিছু সীমাবদ্ধতা সাপেে ব্যাপক মতার অধিকারী হবেন। বোর্ডের সিদ্ধান্তে ভেটো দেয়া ও সদস্যদের অপসারণ করার মতা থাকবে তার। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রাথমিক দায়িত্ব হল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। এর সদরদফতর নিউ ইয়র্কে হলেও প্রথম বৈঠক হয়েছিল ১৯৪৬ সালে লন্ডনে।

ফিলিস্তিনি তহবিল দিয়ে ইসরাইলি পরিবারকে তিপূরণ : ইসরাইলি কর্তৃপ ফিলিস্তিনি কর্তৃপরে (পিএ) আটকানো তহবিল থেকে প্রায় ২৫৮ মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৭১.৬ মিলিয়ন ডলার) ইসরাইলি পরিবারগুলোর কাছে স্থানান্তর করেছে। এসব পরিবার দাবি করেছে, ফিলিস্তিনিদের হামলায় নিহত বা আহতদের জন্য আদালতের রায়ে তিপূরণ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। এ খবর জানিয়েছে আলজাজিরা।

ইসরাইলি সম্প্রচার মাধ্যম আই২৪ নিউজ জানিয়েছে, দেশটির এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড কালেকশন অথরিটি সম্প্রতি একটি বড় ধরনের অভিযান সম্পন্ন করেছে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকানো তহবিল সংগ্রহ করে ১২৫টি তিপূরণ মামলার পরিবারগুলোর কাছে বিতরণ করা হয়। এসব মামলা ইসরাইলি আদালতের রায় অনুযায়ী তিপূরণ ও শাস্তিমূলক অর্থ প্রদানের সাথে সম্পর্কিত। রায়গুলো ইসরাইলি নিহত বা আহতদের পরিবার, হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপরে বিরুদ্ধেও দেয়া হয়েছে। ইসরাইলি কর্তৃপরে দাবি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপ বন্দীদের আর্থিক সহায়তা দেয়, যা হামলার সাথে যুক্তদের জন্য অর্থায়ন হিসেবে দেখা হয়। এ কারণেই পিএ’র তহবিল আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

বাজেয়াপ্ত অর্থ ইসরাইলি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড কালেকশন অথরিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালতের রায় অনুযায়ী তা ইসরাইলি পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপ এর আগেও এমন পদেেপর সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, তহবিল আটকে রাখা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি তাদের চলমান আর্থিক সঙ্কটকে আরো গভীর করছে।

গাজা থেকে হজে যেতে বাধা : গাজা স্ট্রিপের হজ ও ওমরাহ কোম্পানির সমিতি জানিয়েছে, রামাল্লায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় এ বছর গাজার বাসিন্দাদের হজে যেতে বাধা দিয়েছে। তারা বলছে, গাজার হাজিদের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা হয়েছে । মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, সমিতির সদস্য আওয়াদ আবু মাযকুর কুদস প্রেসকে দেয়া বক্তব্যে বলেন, এ সমস্যার জন্য মন্ত্রণালয় সরাসরি দায়ী। তিনি জানান, মন্ত্রণালয় গাজা থেকে যাত্রার ব্যবস্থা বাতিল করেছে এবং এ বছর শুধু বিদেশে বসবাসরত গাজার বাসিন্দাদের জন্য হজের সুযোগ রেখেছে। আবু মাযকুর বলেন, মন্ত্রণালয় গাজার বাসিন্দাদের জন্য নিবন্ধন খুলেছিল, যাদের অনেকেই গত বছর লটারি করে নাম উঠিয়েছিলেন এবং ফি পরিশোধ করেছিলেন। তিনি এটিকে অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, নতুন আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত ছিল।

তিনি আরো জানান, নিবন্ধনের সময়সীমা ছিল মাত্র পাঁচ দিন। এতে মিশরসহ বিদেশে থাকা গাজার বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও গাজার ভেতরে থাকা মানুষদের বাদ দেয়া হয়েছে। ভ্রমণ জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা গাজাবাসীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। আবু মাযকুর জানান, গাজার বার্ষিক হজ কোটায় দুই হাজার ৫০৮ জন হাজি এবং ২৫ জন প্রশাসনিক কর্মী থাকেন। এ বছর প্রায় এক হাজার ৪০০ বিদেশে থাকা গাজার বাসিন্দা নিবন্ধন করেছেন। তার অভিযোগ, মন্ত্রণালয় কোটার সব আসন পূর্ণ হওয়ার আগেই নিবন্ধন বন্ধ করে দিয়েছে এবং বাকি আসনগুলো পশ্চিম তীর ও জেরুসালেমের হাজিদের জন্য বরাদ্দ করেছে। এ বিষয়ে ফিলিস্তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

আল-আকসায় ইহুদি প্রবেশ বেড়েছে ২২ শতাংশ : ২০২৫ সালে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ৬৫ হাজারের বেশি ইহুদি কর্মী প্রবেশ করেছে। আন্তর্জাতিক জেরুসালেম ফাউন্ডেশনের বার্ষিক রিপোর্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইসলামিক ওয়াকফ প্রশাসনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। খবর আনাদোলুর।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে মোট ৬৫ হাজার ৩৬৪ জন প্রবেশ করেছে। এ সময় ইসরাইলি রাজনৈতিক নেতাদের সফরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং কয়েকজন এমপিও আল-আকসায় প্রবেশ করেছেন। রাজনৈতিক সফরের সংখ্যা ২০২৪ সালের ৯ বার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২০ বার। ইসরাইলি কর্তৃপ নতুন কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দর্শনার্থীদের সময়সীমা বাড়ানো, দলগত প্রবেশ সংখ্যা ১২০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করা এবং প্রবেশের বিরতি কমিয়ে আনা। এসব পদপেকে দীর্ঘ দিনের প্রচলিত নিয়ম পরিবর্তনের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরে ইসরাইলিদের গুলিতে ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত : অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরে এক ফিলিস্তিনির গাড়িতে গুলি চালিয়েছে। এতে ৩৫ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। ওয়াফা সংবাদ সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, হেবরনের দেিণ মাসাফের ইয়াত্তা অঞ্চলের উম কুসা এলাকায় কয়েকজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী ফিলিস্তিনিদের বহনকারী একটি গাড়িকে ধাওয়া করে। পরে তারা গুলি চালায়। আহত ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে।

ইসরাইলি সেনারা পরে এলাকায় অভিযান চালিয়ে গাড়ির অন্য যাত্রীদের আটক করে। পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয় এবং আহত ব্যক্তিকে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওয়াফা জানিয়েছে, হামলার পর বসতি স্থাপনকারীরা গাড়িটি দখল করে খিরবেত খাশম আল-দারাজ এলাকায় নির্মিত একটি অবৈধ আউটপোস্টে নিয়ে যায়। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, আহত ব্যক্তির মাথা, হাত ও পায়ে একাধিক গুলির ত রয়েছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক।