ট্রাইব্যুনালে তিন অভিযোগে বিচার হচ্ছে নওফেলের

আলমগীর কবির
Printed Edition
  • ভারতে প্রকাশ্যে আসার পর নতুন আলোচনায় পলাতক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী
  • চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ ২৪ আগস্ট

ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি শারীরিক উপস্থিতি ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে তাকে দেখা যাওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিচার প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল মামলাটিতে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার আগামী ২৪ আগস্ট পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। গত ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল নওফেলসহ ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন। এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ৬২ জন সাক্ষী রয়েছেন এবং তদন্ত কর্মকর্তা ইতোমধ্যেই ৫৫ জনের জবানবন্দী রেকর্ডসহ বিভিন্ন জব্দ তালিকা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছেন।

মামলার এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালত কর্তৃক সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যহীন ও ন্যায্য সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাজপথের এই যৌক্তিক দাবি মেনে না নিয়ে আন্দোলন দমনে চরম আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করে।

গত ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে কটূক্তিমূলক মন্তব্য করার পর পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন সরকারের এই অনড় ও সহিংস অবস্থানের সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতৃত্বের সাথে চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন নীতি-নির্ধারক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ক্ষমতার অপব্যবহার, ১৪ দলীয় জোটের প্রভাব এবং চট্টগ্রাম-৯ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে নওফেল চট্টগ্রামে নিজস্ব একটি ক্যাডার বাহিনী তৈরি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের নেয়া প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহ চট্টগ্রামে বাস্তবায়নে নওফেল সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা, নির্দেশ ও প্ররোচনা প্রদান করেন।

ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা চার্জশিটে সাবেক এই শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিবরণ উঠে এসেছে।

প্রথম অভিযোগ (১৬ জুলাই হত্যা) : ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন মুরাদপুর মোড় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর দলীয় অস্ত্রধারীদের মাধ্যমে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে মুরাদপুর মোড়ে মো: ওয়াসিম আকরাম, সাদিয়াস কিচেনের সামনে ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং বেলাল মসজিদের বিপরীতে মো: ফারুক গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।

দ্বিতীয় অভিযোগ (১৮ জুলাই হত্যা) : ১৮ জুলাই চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাট এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সশস্ত্র হামলা চালায় স্থানীয় যুবলীগ-ছাত্রলীগ। এতে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নিচে তানভীর সিদ্দিকী, কাঁচাবাজারের সামনে সায়মন ওরফে মাহিম এবং পুলিশ বক্সের সামনে হৃদয় চন্দ্র তরুয়া গুলিবিদ্ধ হন (পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জুলাই হৃদয় মারা যান)।

তৃতীয় অভিযোগ (৪ আগস্ট গণহত্যা চেষ্টা ও গুরুতর আঘাত) : ৪ আগস্ট কোতোয়ালি থানাধীন নিউ মার্কেট এলাকায় সকাল ১১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এ ঘটনায় জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা ও আবদুল্লাহসহ শতাধিক ছাত্র-জনতা মারাত্মকভাবে আহত হন।

প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, এসব হামলা ও সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় পরিচালিত ব্যাপক, পদ্ধতিগত ও লক্ষ্যভিত্তিক মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ।

এ মামলায় মোট ২২ জন আসামির মধ্যে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ১৭ জন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অন্য পলাতক আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন ও মো: রেজাউল করিম চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ এবং সুমন দে।

অন্য দিকে, এ মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো: ফিরোজ ও দেবাশীষ পাল দেবুসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ইতোমধ্যেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং শুনানির দিন তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।