ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক নয়া আতঙ্ক ‘বিনাশ দা’

আবু সালেহ আকন
Printed Edition

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন একটিই আতঙ্কের নাম। অপরাধ জগতে অনেকেই এই নামটির সাথে তেমন পরিচিত নয়। অথচ এই নামেই বড় বড় ব্যবসায়ীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। ভাগ বসানো হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়। তার ভয়ে এখন অতিষ্ট ব্যবসায়ীরা। প্রকৃত নাম দিলিপ হলেও ওই সন্ত্রাসী আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘বিনাশ দা’ হিসেবে পরিচিত। কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণও এই বিনাশের হাতে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ‘বিনাশ দা’ এখন আতঙ্কের নাম। ভয়ে অনেকে এই নামটিও উচ্চারণ করেন না। সাম্প্রতিক সময়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড এই বিনাশ দার নির্দেশেই ঘটেছে। কাওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই বিনাশ দার নির্দেশে মুসাব্বিরকে হত্যা করা হয়। দিলিপের নির্দেশে শুটার রহিম ও জিন্নাত সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নিয়ে মুসাব্বিরকে হত্যা করে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ রহিমকে দু’টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতারের পর এ তথ্য পায়। গত ৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী পাড়ায় মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় তার সাথে থাকা আবু সুফিয়ান মাসুদ নামের আরেকজন আহত হন।

এই খুনের পর রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে বিনাশ দা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেও সে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উত্তরা এলাকাসহ আশপাশের অঞ্চলে হুমকি ও প্রভাব খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে চলেছে।

উত্তরা, দক্ষিণখান ও বসুন্ধরা সংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের কাজ নিয়ে তার হুমকি ধমকিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। নানা স্তরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। না দিলে সরাসরি হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, অনেকেই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

একসময় মহাখালী, বাড্ডা, তেজগাঁও ও কাওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং প্রভাবভিত্তিক অপরাধের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ছিলেন দিলীপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘদিনের লিস্টে থাকা এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসা দখল এবং ক্যাডার পরিচালনার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এত কিছুর পরেও এই নামটির সাথে অনেকেই পরিচিত নন। মুসাব্বির হত্যার পর নামটি কয়েকবার শোনা যায়।

‘রোজ করপোরেশন’ নামক প্রক্সি কোম্পানির মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নানা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

রোজ করপোরেশন সম্পূর্ণভাবে বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে এবং তার অধীনে পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। এই কোম্পানির সাথে সম্পর্কিত কোনো ব্যক্তি পরিচালক, কর্মকর্তা বা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট নাম কোনো রেকর্ডে, অনলাইনে বা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি- যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক। বিনাশ দাদা এই ধরনের লো-প্রোফাইল, সম্পূর্ণ অজানা সেটআপ ব্যবহার করে রাডার এড়িয়ে ডিএনসিসিসহ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

রোজ করপোরেশনের এই সেটআপটি অত্যন্ত ভিন্ন ধর্মী ও সন্দেহজনক। অনলাইনে বা অন্য কোথাও এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। পান্থপথের ৬৯/কে, কে কে ভবনের ব্যবহৃত ঠিকানায়ও তাদের অফিস সম্পর্কিত কোনো তথ্য বিভিন্ন ডিরেক্টরি, বাণিজ্যিক তালিকা বা সরকারি রেকর্ডে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিনাশ দাদা এই ধরনের লো-প্রোফাইল বা সম্পূর্ণ অজানা সিস্টেম ব্যবহার করে রাডার এড়িয়ে ডিএনসিসির প্রকল্পগুলো হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। দেশের ভেতরে স্পষ্টভাবে শেল কোম্পানির মতোই সন্দেহজনক সেটআপ, কিন্তু আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত এমন ব্যবস্থা তিনি ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

একসময় মহাখালী, বাড্ডা, তেজগাঁও ও কাওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং প্রভাবভিত্তিক অপরাধের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ছিলেন দিলীপ। ২০১৬ সালের দিকে মহাখালী বা বাড্ডা থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলা থেকেই তিনি দেশত্যাগ করে মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে যান।

ওই মামলাটিই তাকে “মোস্ট ওয়ান্টেড”পলাতক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মূল ভিত্তি বলে গোয়েন্দা সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘদিনের লিস্টে থাকা এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসা দখল এবং ক্যাডার পরিচালনার অভিযোগ বহুবার উঠেছে।

সাম্প্রতিককালে, ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর কাওরান বাজারের বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পূর্বপাশের ফুটপাথে তার নামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দেয়ায় ১৫-২০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি তিনটি পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে দোকানে অগ্নিসংযোগ করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে তেজগাঁও থানায় মামলা রুজু হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিদেশে বসেও দিলীপ তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক অটুট রেখেছেন। এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকে নির্দেশনা দিয়ে স্থানীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ বজায় রাখছেন এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রশাসনের নাকের ডগায় খোদ রাজধানী ঢাকাতেই দিলীপ ওরফে বিনাশ দা একটি সংগঠিত মাফিয়া সিন্ডিকেট পরিচালিত করছে, যা আন্ডারওয়ার্ল্ড, অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়কে একত্র করে আলাদা একটি জগৎ গড়ে তুলেছে।

বিদেশ থেকে পরিচালিত এই ধরনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি দেশীয় সন্ত্রাসবাদের একটি নতুন রূপ, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। প্রায় এক দশক ধরে পলাতক একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী কিভাবে দেশের বাইরে বসে রাজধানীর হৃদয়ে এত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক চালিয়ে যেতে পারছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেন এখনো তার আর্থিক নেটওয়ার্ক, ব্যবসায়িক ছায়া, রাজনৈতিক সংযোগ এবং সহযোগী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না তা নিয়েও প্রশ্ন।