ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন হাসিনা?

রয়টার্স বলছে, হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরো তীব্র করতে পারে। আবার এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চলমান উত্তেজনা কমানোরও একটি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ তাকে আশ্রয় দেয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন? বর্তমানে ভারতে পালিয়ে থাকা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন যে তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন।

দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতায় থেকে ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য অভিযুক্ত পতিত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণও পরীক্ষা হবে।

প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেশে ফিরলে আমাকে গ্রেফতার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হতে পারে। তবুও আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতেই আসুক- যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’

২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। শেখ হাসিনা এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও ট্রাইব্যুনাল এর সন্দেহাতীত প্রমাণ পান।

রয়টার্স বলছে, হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরো তীব্র করতে পারে। আবার এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চলমান উত্তেজনা কমানোরও একটি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ তাকে আশ্রয় দেয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে।

ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম শেখ হাসিনা কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিলেন। তিনি ভারতের কথা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করে জানান, কোনো বিদেশী সরকারের সাথে প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা করেননি। ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরবেন। ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। আওয়ামী লীগের অন্যান্য নির্বাসিত নেতারাও একইভাবে আত্মসমর্পণ করবেন।

রয়টার্স উল্লেখ করেছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন। কিন্তু তিনি মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে ফিরবেন কি না সেটি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

ফ্যাসিবাদের আইকন হিসেবে চিহ্নিত শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, ‘সরকার আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। এ জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি পাঠাচ্ছে। কিন্তু আমি নিজেই ফিরে যাব।’

বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কোনো জবাব দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এপ্রিল মাসে তারা জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং নতুন সরকারের সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারত আগ্রহী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাস করি। বিচার শুরু হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে আদালতের কার্যক্রম কতটা প্রহসনমূলক। আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’

তবে তিনি কবে ফিরবেন, কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন- সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি।

হাসিনা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার- এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’ একটি ধারণা সাধারণভাবে রয়েছে যে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি যে দেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সে দেশের সরকারের বা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে গোপন কোনো সমঝোতায় নিজের বিষয়ে আশ^স্ত হতে চাইবেন। এ বিষয়টার প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা এ কথা বলতে পারেন।

কারাবাস নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন বলেও জানান। অতীতে সামরিক শাসনের সময় ও ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেছিলেন বলে স্মরণ করেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি নিজের নিরাপত্তার হুমকির কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতে পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।’

তিনি আরো জানান, আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তিনি অনলাইনে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টির নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে নির্বাচনে অংশ নিতে না-ও দেয়া হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? যদি আমরা খারাপ করে থাকি, তাহলে জনগণই সেই সিদ্ধান্ত নিক।’

আদালতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার মামলার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলে থাকতে পারেন। দল হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার বিষয়টি প্রমাণ হলে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সাক্ষাৎকারের রাজনৈতিক তাৎপর্য

রয়টার্সের এই সাক্ষাৎকারটি শেখ হাসিনার পলায়ন-পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। ১. প্রথমবার নির্দিষ্ট প্রত্যাবর্তনের সময়সীমা- এ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বললেও এবার প্রথমবার ডিসেম্বরকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে একটি নতুন অবস্থান।

২. প্রত্যর্পণ নয়, স্বেচ্ছায় ফেরা- তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমি নিজেই ফিরে যাব।’ অর্থাৎ তিনি ভারত সরকারের মাধ্যমে প্রত্যর্পিত হওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে ‘স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ’ করার বার্তা দিতে চাইছেন। তবে সেটি তিনি শেষ পর্যন্ত করবেন কি না সেটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

৩. আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের প্রচেষ্টা- সাক্ষাৎকারে তিনি বারবার বলেছেন- আদালত প্রহসনমূলক; নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার; গণতন্ত্র নেই। এগুলো মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের ভাষ্য।

৪. আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা- শেখ হাসিনা নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করলেও দলকে নিষিদ্ধ না করার জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছেন। তিনি নিজে নেতৃত্বে না থাকার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এর আগে একাধিকবার তার মা রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ করেছিলেন।

৫. ভারতের পক্ষেও একটি বার্তা- হাসিনা বলেছেন যেকোনো বিদেশী সরকারের সাথে প্রত্যাবর্তন নিয়ে তিনি আলোচনা করেননি। এর মাধ্যমে ভারতকে রাজনৈতিক অস্বস্তি থেকে দূরে রাখারও চেষ্টা দেখা যায়।

সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব

যদি শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরেন, তাহলে কয়েকটি বড় ঘটনা ঘটতে পারে- তাকে বিমানবন্দরেই গ্রেফতার করা হতে পারে; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে; হাসিনার অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হলে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতে পারে। সাক্ষাৎকারের শুরুতে তাকে ‘হত্যা’ করা হতে পারে বলে মন্তব্য এর ইঙ্গিত হতে পারে। হাসিনা ফিরলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গতিও পেতে পারে; নির্বাচন, গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।