ক্রীড়া প্রতিবেদক
কিছু বিদায় পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। কিছু বিদায় ট্রফির সংখ্যাতেও আটকে থাকে না। কিছু বিদায় শুধু বুকের ভেতর নীরব একটা শূন্যতা তৈরি করে। সাদিও মানের সেনেগাল অধ্যায়ের শেষটাও ঠিক তেমনই।
এখন থেকে সেনেগালের সবুজ-হলুদ জার্সি মাঠে নামবে, জাতীয় সঙ্গীত বাজবে, গ্যালারিতে ঢেউ উঠবে। কিন্তু সেই পরিচিত নম্বর, সেই বিদ্যুৎগতির দৌড়, প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হাসিমাখা মুখটি আর দেখা যাবে না। যেন আফ্রিকার আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল।
সেনেগালের ফুটবল ইতিহাসে সাদিও মানে শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি একটি স্বপ্নের নাম। এমন এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা বিশ্বাস করতে শিখেছিল আফ্রিকার একটি দেশও বিশ্বের সেরা মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। ২০১২ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন দলের প্রাণ, অনুপ্রেরণা এবং সবচেয়ে বড় ভরসা। গোল করেছেন, করিয়েছেন, আবার প্রয়োজন হলে দলের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে কাঁধ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
সেনেগালের ইতিহাসে প্রথম ২০২১ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা। সেই অবিস্মরণীয় রাতে শেষ পেনাল্টিটি জালে জড়িয়ে মানে শুধু একটি ট্রফিই জেতাননি, কোটি সেনেগালিয়ানদের বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের মঞ্চেও তিনি ছিলেন দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। চোটের কারণে ২০২২ বিশ্বকাপ মিস করার বেদনাও তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন নিঃশব্দে। কারণ দেশের জন্য খেলাটা তাঁর কাছে ছিল দায়িত্বেরও বেশি। এটি ছিল ভালোবাসা।
মানের গল্প কখনো শুধু ফুটবলের ছিল না। দরিদ্র গ্রাম থেকে উঠে এসে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাবে খেলা, তারপর নিজের গ্রামের জন্য স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ গড়ে তোলা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় পরিচয় কেবল তার পায়ের জাদু নয়, তার হৃদয়ের উদারতাও। তাই সেনেগালের জার্সি থেকে সাদিও মানের বিদায় মানে কেবল একজন ফরোয়ার্ডের অবসর নয়। এটি একটি সময়ের পরিসমাপ্তি। এমন এক অধ্যায়ের শেষ, যেখানে প্রতিটি গোলের সাথে জড়িয়ে ছিল একটি জাতির হাসি, প্রতিটি জয় ছিল আত্মবিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞা।
হয়তো আগামী দিনে নতুন কোনো তারকা জন্ম নেবে। নতুন কেউ গোল করবে, নতুন ইতিহাসও লিখবে। কিন্তু সাদিও মানের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না। কারণ কিংবদন্তিরা শুধু ম্যাচ জেতেন না, তারা মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেন। সেনেগালের জার্সিতে সাদিও মানেকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাস খুললেই, প্রতিটি গর্বের পাতায়, প্রতিটি স্বপ্নের গল্পে তার নামটি চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে লেখা থাকবে।
ঘোষণাটা আগেই দিয়ে রেখেছিলেন সাদিও মানে। বিশ্বকাপ শেষেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের পাট চুকাবেন।
কথা রাখলেন সেনেগালের কিংবদন্তি। বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে সেনেগালের বিদায় নিশ্চিত হতেই অবসরের ঘোষণা দিলেন। তাতে একটা যুগেরই যেন সমাপ্তি ঘটল। ১৪ বছরের বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ারের পথচলা থামিয়ে দিলেন সাদিও মানে।
২০১২ সালে সেনেগালের হয়ে অভিষেক হওয়া মানে দেশের হয়ে ১৩০ ম্যাচ খেলে সর্বোচ্চ ৫৪ গোল করেছেন। সেনেগালের হয়ে জিতেছেন ২০২১ আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স। সর্বশেষ টুর্নামেন্টেও মরক্কোকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। কিন্তু ফাইনালে রেফারির পেনাল্টি দেয়ার প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের শিরোপা কেড়ে নিয়েছে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল। পরে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়।
বিদায়ী বার্তায় সেনেগালের মানুষদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে মানে বলেছেন, ‘এই পতাকার জন্য আমি সব কিছু উৎসর্গ করেছি। নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছি এবং মাতৃভূমির জন্য সব সময় প্রাণপণ লড়েছি। আপনাদের অবিচল সমর্থনই ছিল আমার সফলতার মূল চালিকাশক্তি।’
আন্তর্জাতিক ছাড়লেও ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যাবেন মানে। বর্তমানে আল-নাসরের হয়ে সৌদি প্রো-লিগ মাতাচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। এ ছাড়া লিভারপুল ও বায়ার্ন মিউনিখের মতো দলের হয়েও খেলেছেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে সম্পর্কের ছেদ ঘটলেও আগামীতে দেশের ফুটবলে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চান মানে। ‘আগামীতে নিজের অভিজ্ঞতাকে দেশের সেবায় কাজে লাগাতে পারলে অত্যন্ত আনন্দিত হবো। কোচিং স্টাফের অংশ, কোচ হিসেবে ডাগআউটে বসেই হোক, কিংবা প্রশাসনিক কোনো ভূমিকায়।’



