বিশেষ সংবাদদাতা
- বাজেটে জীবাশ্ম জ্বালানির বরাদ্দে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চ্যাপ্টা হচ্ছে- গোলাম মোয়াজ্জেম
- মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাড়ানো নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা- ড. মোশাহিদা সুলতানা
জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রে আমরা মূলত একটি ‘দুষ্টচক্রের’ মধ্যে আটকে আছি। বিগত সময়ে পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়ে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছিল। জ্বালানি নিরাপত্তাকে জিম্মি করে দেশে উৎসব করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আমরা এই ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে চাই। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে আমাদের জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, জ্বালানি খাত ‘পয়জনাস ডেভিলস নেটওয়ার্কের’ কবজায়।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল রোববার বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ঢাকা স্ট্রিম যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি সমীকরণ’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির এম খালিদ মাহমুদ। বক্তব্য রাখেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, পরিকল্পনা কমিশন, সদস্য, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ ড. মনজুর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা রিতু, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ (সিইআর) পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ। ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।
সিপিডির উপস্থাপনায় বলা হয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানি (ফসিল ফুয়েল) নির্ভর প্রকল্পে প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যা সবুজ রূপান্তরের অন্তরায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কার্যকর কর ছাড় ও আর্থিক প্রণোদনা দেয়া জরুরি। আর জ্বালানি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। এজন্য সোলার প্যানেল এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির (যেমন : কোয়ালিটি ব্যাটারি) আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানোর জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রত্যাশা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন খুবই ধীরগতির। ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা পূরণে বাজেটে সুস্পষ্ট অর্থায়ন ব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন কৌশল রাখতে হবে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এই নেটওয়ার্কের বিষ থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত জ্বালানি খাতের কাঠামোগত ত্রুটি থেকে বের হতে না পারব, ততক্ষণ ভর্তুকি দিয়ে যেতে হবে।’ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, জ্বালানি খাতে দাম সমন্বয় করা সরকারের পক্ষে কঠিন, কারণ এটি মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়। সম্প্রতি ন্যূনতম দাম সমন্বয়ের ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকার পাঁচটি কাজ করতে পারে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, জ¦ালানির এই সঙ্কটকে যদি আমরা মোটা দাগে তিনটি ভাগে বিভক্ত করি, তবে প্রথমটি হলো, বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং তার প্রকৃত ব্যবহারের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এই ফারাকের কারণে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা সক্ষমতার মাশুল হিসেবে জনগণের বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয় হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিগত সময়ে এমন কিছু অস্বচ্ছ চুক্তি করা হয়েছে এবং সেগুলোকে আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। যা প্রকৃত ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তৃতীয়ত, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী এবং টেকসই অর্থনীতির জন্য যে ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল, তা চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
ড. তিতুমীর বলেন, আমরা ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি চাই। এ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বাড়বে। বিনিয়োগ, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ গৃহস্থালির ভোক্তার ক্ষেত্রে আয়ের সাথে সমন্বয় করে দাম কাঠামো তৈরি করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতি কাঠামো এমন হবে যাতে আমদানিনির্ভর প্রবণতা কমে। অর্থাৎ সরকার উৎপাদননির্ভর হতে চায় এবং স্বনির্ভরতার দিকে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশীয় উপায়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো পরিকাঠামো ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সরকারকে প্রতি মুহূর্তে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অতীতে এমন সব চুক্তি করা হয়েছে যার জন্য বর্তমানে ভুগতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক সঙ্কট। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একজন কেতাবি অর্থনীতিবিদ হয়তো বলবেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দামের তাৎক্ষণিক সমন্বয় করতে। কিন্তু একটি সরকার যখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে, তখন হুট করে দাম বাড়ানো অত্যন্ত দুরূহ। কারণ, জ্বালানির দামের সাথে মূল্যস্ফীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ক্ষেত্রে আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। এ থেকে আমরা বছরে মাত্র দুই শতাংশের মতো জ¦ালানি পাই। তিনি বলেন, জ¦ালানি খাতে গত বছর ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। যা দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট সোলার করতে পারতাম। এই খাতে আমাদের সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এই খাতে আমদানি শুল্ক কমালে ক্যাপাসিটি বাড়বে।
ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন, আগামী বছর সরকার এই খাতে ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারলে আমরা বলব উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে। তিনি বলেন, স্রেডা কেন দুর্বল হবে? সেখানে তো যোগ্যরাই আছে। মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। প্রয়োজন হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সঙ্কট কাটানো সম্ভব নয়। সৌরবিদ্যুৎ, বিকেন্দ্রীকৃত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ওপর কর-ভ্যাট কমানো দরকার। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিতে যাচ্ছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে।



