তীব্র পানি সঙ্কটে বরেন্দ্র অঞ্চলে মরুকরণের শঙ্কা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

তীব্র পানি সঙ্কটে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে মরুকরণের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এমন শঙ্কা রয়েছে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাট এই ৫টি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলের প্রায় এক কোটি মানুষ তীব্র খাবার পানি ও সেচ সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলের পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যায়। অতিরিক্ত বোরো ধান চাষের জন্য হাজার হাজার গভীর নলকূপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে মাটির নিচের পানির ভাণ্ডার ফাঁকা হয়ে পড়ছে। অন্য দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে স্থানীয় নদ-নদী, খাল-বিল ও পুকুর সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ না হওয়ায় অনেক এলাকার সাধারণ টিউবওয়েলে এখন আর পানি উঠছে না। বিশেষজ্ঞরা রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাঁধাইড় ইউনিয়নের মতো বেশ কিছু এলাকাকে ইতোমধ্যে ‘ওয়াটার স্টেজ এরিয়া’ বা পানি সঙ্কটপূর্ণ অতি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গবেষণা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি অনাবৃষ্টি, তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতা পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে। মাঠের পর মাঠ কৃষিজমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, যা মরুকরণের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। মাটির উর্বরতা হ্রাস পাওয়ায় ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষকেরা বোরো মৌসুমে চাষাবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং পানি বিশেষজ্ঞরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর তাগিদ দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই হাজারেরও বেশি পুকুর ও খাল পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। একই সাথে বোরো ধানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম পানি লাগে এমন বিকল্প ফসল (যেমন- ডাল, তেলবীজ, গম ও ভুট্টা) চাষের দিকে কৃষকদের উৎসাহিত করতে না পারলে এই অঞ্চলের মরুময়তা ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলা ঘুরে মরুকরণের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা গেছে। এক সময় উর্বর থাকা এসব অঞ্চলের মাটি এখন পানির অভাবে শক্ত ও ধূসর হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে যেখানে ৭০-৮০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরেও সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানি মিলছে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের তীব্র খরাপ্রবণ এলাকায় পানির স্তর স্থানভেদে ২০০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য নারীদের মাইলের পর মাইল হেঁটে দূরের গভীর পাম্পে যেতে হচ্ছে। সেচের পানি না পেয়ে বিঘার পর বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকছে, আর যা-ও চাষ হচ্ছে তা খরার তাপে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে পরিবেশবিদ ও নদী গবেষকদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের এই সঙ্কট কেবল প্রাকৃতিক নয়, বরং মানবসৃষ্ট। নদীগুলোর নাব্য হারিয়ে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতি-ব্যবহার এই সঙ্কটকে ত্বরান্বিত করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই যদি ভূগর্ভস্থ পানি তোলার ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নেয়া হয়, তবে আগামী এক দশকে এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা স্থায়ী মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।