রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ঈদ করার স্বপ্ন অপূর্ণই থাকছে

Printed Edition
উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের একটি আশ্রয়শিবির : নয়া দিগন্ত
উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের একটি আশ্রয়শিবির : নয়া দিগন্ত

হুমায়ুন কবির জুশান উখিয়া (কক্সবাজার)

‘আগামী রমজানে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ঈদ করবে এবং স্বজনদের কবর জিয়ারত করবে’ গত বছর উখিয়ার ইনানীতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই আশার বাণী শুনিয়েছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহম্মদ ইউনূস। সেই ঘোষণার এক বছর পূর্ণ হতে চললেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে আবারো এক অনিশ্চিত ঈদ সামনে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে দিন কাটছে ১০ লক্ষাধিক শরণার্থীর। তাদের স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে নৃশংস দমন-পীড়নের মুখে যে বিশাল শরণার্থী ঢল বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তার পর থেকে দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক নানা বৈঠক, উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা আর দফায় দফায় আশ্বাসের পরেও একজন রোহিঙ্গাকেও নাগরিকত্বের মর্যাদা দিয়ে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি এখন পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে।

উখিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাঈদ মোহাম্মদ আনোয়ার অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ১৯৯১ সালেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিল। সে সময় তৎকালীন সরকারের কূটনৈতিক দৃঢ়তা ও সামরিক তৎপরতার কারণে মিয়ানমার দ্রুত প্রত্যাবাসনে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকারের নমনীয় কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক চাপের অভাব প্রত্যাবাসনকে কার্যত অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান ও ফয়েজুর রহমান বলেন, আমরা আমাদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু সেখানে আমাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সেই নিশ্চয়তা ছাড়া আমরা মরতে ফিরে যাব না। ক্যাম্পের নারী শরণার্থী সেতারা বেগম ও সানজিদা বলেন, ডক্টর ইউনূসের কথায় আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম যে, এবার হয়তো দাদার কবর জিয়ারত করতে পারব। কিন্তু এক বছরে কিছুই বদলায়নি। এখন তো ক্ষমতার পরিবর্তনও হয়ে গেছে। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই, আমাদের যেন সম্মানের সাথে নিজ দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট এখন কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট গ্যারান্টি ছাড়া কোনো সমাধানই টেকসই হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা এবং নতুন সরকারের জোরালো কূটনীতি ছাড়া ১০ লাখ মানুষের এই অনিশ্চয়তা কাটানো অসম্ভব। আপাতত সেই অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়েই আরেকটি ঈদ কাটাতে হচ্ছে ক্যাম্পের প্লাস্টিক ও বাঁশের খুপরিতে।