অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিক পতনের কারণে পুুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফের হতাশা তৈরি হচ্ছে। গতকাল নিয়ে টানা সাতটি কর্মদিবস সূচক হারিয়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই দিনের শুরুতে বাজার আচরণ ভালো থাকলেও একপর্যায়ে তৈরি হচ্ছে বিক্রয়চাপ। আর এ চাপই দিনশেষে পতন ঘটাচ্ছে সূচকের। বাজার সংশ্লিষ্টরা এহেন বাজার আচরণের নানা কারণ উল্লেখ করলেও তা ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের মাঝে তৈরি করছে হতাশা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার দ্বায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পুঁজিবাজারের সংস্কারের কথা বলা হলেও এখনো তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) পরিবর্তন আসবে। কিন্তু দুই মাসের বেশি সময় পার হলেও তার কোনো অগ্রগতি দেখছেন না বিনিয়োগকারীরা। এ ধরনের একটি সংবেদনশীল আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় কারা আসছেন তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে কমবেশি অস্বস্তি কাজ করছে, যা তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী নয়া দিগন্তকে বলেন, বরাবরই কিছু সক্ষম গ্রুপই পুঁজিবাজারকে নিয়ন্ত্রক করে থাকে। বাজারের লেনদেন ও সূচকের উত্তান-পতনে এদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সম্প্রতি বর্তমান কমিশন বেশ কিছু বিও একাউন্টের তথ্য জানতে চেয়ে বিভিন্ন হাউজে চিঠি দিয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন হাউজেই দেখা যাচ্ছে এ ধরনের ব্যক্তিরা ক্রমশ সাইড লাইনে চলে যাচ্ছেন। এতে বাজারের লেনদেন যেমন- হ্রাস পাচ্ছে তেমনি এদের সৃষ্ট বিক্রয়চাপই সূচকের পতন ঘটাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, সরকার বিএসইসি পুনর্গঠনের কথা বারবার বলছে, কিন্তু এখনো তা কার্যকর হচ্ছেনা। তবে পরিবর্তন যে হবে তা নিয়ে এখন কারো সন্দেহ নেই। তাই সক্ষম বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ধীরে চলোনীতি অনুসরন করছেন। তারা মনে করছেন আগে কমিশন গঠিত হোক, তারপর কমিশনের মনোভাব দেখেই তারা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেবেন। তার মতে,এসব কারণে খুব বেশি মাত্রায় না হলেও ধারাবাহিক পতনের ফাঁদে আটকে পড়েছে পুঁজিবাজার। তবে তিনি আশাবাদি, কমিশন পুনর্গঠন হলে বাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
আগের দিনগুলোর ধারাবাহিকতায় গতকালও দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল ১৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২২০ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২০৫ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৫ দশমিক ২২ ও শূন্য দশমিক ৬৫ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২ দশমিক ৮০ পয়েন্ট হারায়। দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৯৪ ও ৩ দশমিক ৬১ পয়েন্ট।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের বিভিন্ন ট্রেডিং ফ্লোরে বিনিয়োগকারিদের সঙ্গে কথা বললে তারা বাজারের টানা পতনে নিজেদের হতাশা প্রকাশ করেন। পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের নীরবতার প্রসঙ্গ উল্লেখ বরে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার পুঁজিবাজারের সংস্কারের বিশেস করে বিএসইসি’র পুনর্গঠনের কথা বার বার বলে আসছে। কিন্তু দু’মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো তা করা হচ্ছেনা। বর্তমান কমিশন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে পুঁজিবাজারে একটি নেতিবাচক মনোভাব কাজ করছে। বাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ স্টেকহোল্ডার বর্তমান কমিশনের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে অবহিত। কিন্তু সরকার এখনো নতুন কমিশন গঠন করছে না। এতে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে যার প্রতিফলন ঘটছে বাজার আচরণে।
তারা আরো বলেন, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত নিয়ে বর্তমান কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বায়িত্বহীনতার কারণে এ মুহুর্তে পথে বসে গেছে। এমন অনেকেই আছেন এই দুই সংস্থার দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তের কারণে যারা তাদের বিনিয়োগ করা অর্থের প্রায় পুরোটাই হারিয়ে বসে আছেন। তাই বিনিয়োগকারীরা চায় নতুন কমিশন এসে তাদের এ লোকসানের জন্য কিছু একটা করবে। কারণে এ দুই খাতের অব্যবস্থাপনার জন্য কোনোভাবেই বিনিয়োগকারীদের দায়ী করা যায় না। বিষয়গুলোর যৌক্তিক সমাধান হলে বিনিয়োগকারীরা বাজারের প্রতি আবার আস্থাশীল হবে। আর নতুন কমিশন গঠন করা ছাড়া এটা সম্ভব নয়।
গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে মুন্নু সিরামিকস। ৩৬ কোটি ৪২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকায়
৪৪ লাখ ৮৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ডমিনেজ স্টিল উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি থাই ফুডস, লাভেলো আইসক্রিম, এপেক্স ফুটওয়্যার, স্যালভো কেমিক্যালস, আমান ফিড, আর ডি ফুডস, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও মুন্নু ফেববিৃ
ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল এপেক্স ট্যানারি। গতকাল ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আরডি ফুডস। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনালী পেপার অ্যান্ড পাল্প, বিডি অটোকারস, আমান ফিড, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বিডি ল্যাম্প, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও দেশ গার্মেন্ট।



