কাওসার আজম, মাদারীপুর থেকে ফিরে
এক সময় উন্নতমানের ফল, ফুল কিংবা অর্নামেন্টাল উদ্ভিদের চারা সংগ্রহে বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন একটি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু থেকেই দেশের সরকারি ল্যাবগুলোতে উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা। একই সাথে ক্যাকটাসের মতো উচ্চমূল্যের শৌখিন উদ্ভিদও আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তি, গবেষণা, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং মানসম্মত চারা উৎপাদনের সমন্বয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার এখন দেশের উদ্যান খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে।
সরকার যখন আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বৃক্ষরোপণের জন্য দরকার চারা। সরকার ১০ হাজার নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার যেন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বছরে ১.৬০ লাখ চারার লক্ষ্য
গত অর্থবছরে এক লাখ ৩২ হাজার চারা উৎপাদিত হয় মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে। চলতি অর্থবছরে এক লাখ ৬০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে ২৫ জাতের আম ছাড়াও পেয়ারা, লেবু, সিডলেস লেবু, জামরুল, কদবেল, আতা, নারিকেল, আগাম ও আঠাবিহীন কাঁঠাল, বিভিন্ন জাতের জাম, বারোমাসি কাটিমন, সুপারি এবং টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে প্রায় ২০ হাজার চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এর বড় অংশই ফুলের চারা।
গত অর্থবছরে কেন্দ্রটি প্রায় ৫২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছে মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার। চলতি বছর বিক্রি আরো বাড়বে বলে আশা করছেন কেন্দ্রের উপপরিচালক আশুতোষ কুমার বিশ্বাস।
ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ মো: এনামুল হক জানান, নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে সংগ্রহ করা শুট টিপ প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। পরে বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে স্থাপন করলে উদ্ভিদ হরমোনের প্রভাবে কোষ বিভাজন শুরু হয়।
তিনি বলেন, ল্যাবে উৎপাদিত চারা সরাসরি মাঠে দেয়া হয় না। প্রথমে পলি হাউজ ও হার্ডেনিং জোনে বাইরের পরিবেশের সাথে ধাপে ধাপে খাপ খাইয়ে নেয়া হয়।
তিন ল্যাবে দুই লাখের বেশি চারা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহের তিনটি টিস্যু কালচার ল্যাবে দুই লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে লিলিয়ামের চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় আট হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। আগামী মৌসুমে লক্ষ্য ২০ হাজার। পাশাপাশি স্টেভিয়ার পরীক্ষামূলক উৎপাদনও চলছে।
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প শুধু চারা উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণেও সহায়তা করছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর। তিনি জানান, ইতোমধ্যে হাজারো কৃষি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অনেকে টিস্যু কালচার চারা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ফুল, ফল এবং উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ শুরু করেছেন।
২১০ প্রজাতির ক্যাকটাসের ভাণ্ডার
সেন্টারের আরেকটি বড় আকর্ষণ ক্যাকটাস জার্মপ্লাজম সেন্টার বা ক্যাকটাস হাউজ। মাত্র দুই বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকা ও বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে এখানে ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস সংরক্ষণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার ক্যাকটাস সংরক্ষিত রয়েছে এবং ৬০টি ভ্যারাইটি বিক্রির জন্য প্রস্তুত।
উপপরিচালক আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, শুরুতে অধিকাংশ ক্যাকটাসই আমদানিনির্ভর ছিল এবং উচ্চমূল্যে কিনতে হতো। পরে নিজেদের উদ্যোগে উন্নত জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে উৎপাদন শুরু করা হয়।
সারা দেশ থেকে ক্রেতা
মাদারীপুরের এই ক্যাকটাস এখন আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, সংগ্রাহক এবং নামীদামি নার্সারির প্রতিনিধিরা এখানে আসছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান একসাথে ৫০টি পর্যন্ত ভ্যারাইটির প্যাকেজ সংগ্রহ করছে। গত অর্থবছরে কেন্দ্রটি প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার টাকার ক্যাকটাস বিক্রি করেছে।
গবেষণা থেকে রফতানির সম্ভাবনা
স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম এ রহিম বলেন, ভাইরাসমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদনে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মাণাধীন ল্যাবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানিমুখী উদ্যান খাতের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিম বলেন, আধুনিক কৃষিতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে তিনটি ল্যাবে সফলভাবে উৎপাদন হচ্ছে। নতুন ল্যাব চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নত চারার প্রাপ্যতা আরো বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।



