ইংল্যান্ডের অতি রক্ষণাত্মক কৌশল

মেক্সিকো পারেনি আর্জেন্টিনা পেরেছে

Printed Edition
ফাইনাল নিশ্চিতের পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে কাঁধে তুলে সতীর্থদের নিয়ে উদযাপন করছেন এনজো ফার্নান্দেজ  : ইন্টারনেট
ফাইনাল নিশ্চিতের পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে কাঁধে তুলে সতীর্থদের নিয়ে উদযাপন করছেন এনজো ফার্নান্দেজ : ইন্টারনেট

রফিকুল হায়দার ফরহাদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে

এগিয়ে থেকে ধরে রাখতে হবে এই লিড। কারণ প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী। তাই ডিফেন্স লাইনে লোক বাড়ান টমাস টুখেল। ইংল্যান্ডের এই জার্মান কোচের শেষ ১৫-২০ মিনিটে অতি রক্ষণাত্মক কৌশল কাজে দিয়েছিল মেক্সিকোর বিপক্ষে। তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে আর রক্ষা পাওয়া যায়নি। লিওনেল মেসি বাহিনী পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতে নিয়েছে। ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চলে গেছে বিশ্বকাপের ফাইনালে। ১৯ জুলাই যে ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন।

৫ জুলাই মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে সেরা ষোলোর ম্যাচ। ৩৬ ও ৩৮ মিনিটে জুড বেলিংহ্যামের গোলে এবারের বিশ্বকাপের কো-হোস্ট মেক্সিকোর বিপক্ষে ২ গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে স্কোর ইংল্যান্ড ৩-২ মেক্সিকো। বাকি সময়ে এই লিড ধরে রাখার জন্য ইংল্যান্ড দলের কোচ টুখেল ভাণ্ডারে থাকা সব দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারকে নামান। যাদের উচ্চতা ৬ ফুটের ওপরে। ৮০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে মেক্সিকানরা তখন চড়াও হয়ে খেলছিল ইংলিশদের ওপর। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ীরা ঠিকই সেই স্কোরলাইন বহাল রেখে ম্যাচটি জিতে আসে। আজতেকায় ইংল্যান্ড পার পেয়ে এলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় আর বাঁচা যায়নি। পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনা ঠিকই সমতা আনার পর এগিয়ে যায়। এরপর ইংলিশদের শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নকে আরো চার বছরের জন্য অপেক্ষায় রেখে মেসিরা চলে গেল ফাইনালে।

আসলে মেক্সিকো সেই ম্যাচে পারেনি নিজেদের ভুলে। একে তো তাদের কোনো ক্রসই নিখুঁত হয়নি। আর অধিকাংশ ক্রস আগেই ডিফেন্ডার কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়। আরেকটি বিষয়, শুধু ক্রস আর থ্রু পাসই গোলের উৎস হয় না। দূরপাল্লার শটেও গোল হয়। তা বেশ দর্শনীয়ও। কিন্তু ইংলিশদের বিপক্ষে মেক্সিকানরা একটি শটও নেয়নি বক্সের বাইরে থেকে। পুরনো সেই ল্যাটিন ফুটবলীয় কৌশলে বক্সের সামনে বল নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছে। শতভাগ নিশ্চিত হয়ে ছোট পাস বা থ্রু পাসে গোলের চেষ্টা করেছে এবং যথারীতি ব্যর্থ। তা ছাড়া মেক্সিকোর কোচ সেই ম্যাচে দলের সবচেয়ে সফল এবং ইনফর্ম স্ট্রাইকার জুলিয়ান কুইনোনেসকে ৮০ মিনিটে তুলে নেন। যার এবারের বিশ্বকাপে গোল ছিল ৪টি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্কোর ১-২ করা গোলটিও ছিল তার। আরেকটি বিষয়, তাদের দলে তো জুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজ এবং দলের মূল প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি নেই। কে গড়ে দেবেন পার্থক্য। আসলে এ জন্যই তারা মেক্সিকো। আর আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনাই। এত ফুটবল ক্রেজ থাকা সত্ত্বেও মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেমিতেও উঠতে পারেনি। আর আর্জেন্টিনা সপ্তমবারের মতো ফাইনালে।

আসলে আর্জেন্টিনা দলে যেমন মেসি আছেন তেমনি নিখুঁত ক্রসের জন্য বদলি হিসেবে নামা রদ্রিগো ডি পলও আছেন। আর ফিনিশারের ভূমিকায় লাউতারো মার্টিনেজ, জুুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্ন্দাদেজ এবং ছোটখাটো গড়নের ম্যাক অ্যালিস্টরদের উপস্থিতি। ডি পল ও মেসিদের ক্রস বা পাস কোথায় আসবে সেই পজিশন সেন্সটা আছে মার্টিনেজ, ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টারদের; যা ছিল না মেক্সিকানদের। ইংলিশ লিগে খেলা এনজো ফার্নান্দেজ কয়েকবার চেষ্টা করেছেন দূর পাল্লার শটে গোল করার। কোনোটি ক্রসবার-ঘেঁষে গেছে। কোনোটি ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিকফোর্ড গোল হতে দেননি। তবে ৮৫ মিনিটে ঠিকই সফল। মেসির পাস থেকে আসা বল নিয়ন্ত্রণে নেন ফার্নান্দেজ। এরপর বক্সের বাইরে থেকে নেয়া তার ডান পায়ের প্রচন্ডণ্ড শট পরাস্ত করে পিকফোর্ডকে। ডান দিকে পুরো শরীর ভাসিয়েও বল আটকাতে পারেননি ইংলিশ কিপার।

৫৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা গর্ডনের গোলে পিছিয়ে পড়ে। এ অবস্থা ৮৪ মিনিট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ততক্ষণ পর্যন্ত ভাষ্যকারদের মুখে বারবারই উচ্চারিত হচ্ছিল, ‘এটিই হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।’ সাথে এটাও বলা হচ্ছিল, ‘আর্জেন্টিনা দলে মেসি আছে, তার পক্ষে খেলা পাল্টে দেয়া সম্ভব।’ ভাষ্যকারের পরের কথাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মেসি নিজে কোনো গোল করতে পারেননি। কোনো শটও নেননি বিপক্ষ পোস্টে। তবে বেশ কয়েকটি ক্রস ভাসিয়েছেন। কর্নার করেছেন একাধিক। শেষ পর্যন্ত ৯ মিনিট ইনজুরি টাইমের ২ মিনিটে সফল তার ক্রস। আর্জেন্টাইন অধিনায়কের ডান পায়ের ক্রসে ফাঁকা হেডে দলের জয় নিশ্চিত করেন লাউতারো মার্টিনেজ। ইংল্যান্ডকে ফ্রান্সের সাথে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে বাধ্য করে এখন শিরোপার রেসে। আরেকটি বিষয়, লাউতারো মার্টিনেজকে দিয়ে করানো গোলটি বিশ্বকাপ ফুটবলে মেসির ১২তম অ্যাসিস্ট; যা একটি রেকর্ড।