বিতর্ক থামছে না জাতীয় গৃহায়নে

বদলি, পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়মে একাধিক সিন্ডিকেট তৎপর

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। অভিযোগ রয়েছে, ভালো পোস্টিং, প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা নেয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক বলয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেবাদানকারী সংস্থা হিসেবে সুনামও ক্ষুণœ হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র বলছে, সেবার মানোন্নয়নে কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায়ই আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ফলে সাধারণ মানুষের সেবার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমর্যাদা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয় আড়াল করতে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেয়া, বদলি করানো কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে দুর্বল মনে হলে তাকে চাকরিচ্যুত করার চেষ্টাও করা হয়। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডগুলো বেশি সামনে আসায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক ও সেবামূলক উদ্যোগগুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এমন এক অভিযোগের শিকার হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার দাবি করেছেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহীন। তার দাবি, আমি পদবি পরিবর্তনপূর্বক অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অফিস আদেশের প্রেক্ষিতে হিসাব সহকারী পদের পরিবর্তে অফিস সহকারী পদে পদায়ন হই। এতে কোনোরূপ অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হয়নি। তিনি দাবি করেন, এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে প্রায় এক বছর চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাখা হয়েছিল। পরে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় গত ১৬ আগস্ট তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। মোস্তফা কামাল শাহীনের ভাষ্য, তাকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, দুদকের মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি, ব্যবসার জন্য একাধিক পাসপোর্টধারী এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক এমন নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি দুদকের কোনো মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি নই। আমি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রও ছিলাম না। একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করানো হয়েছে। পরে তারাই দুদকে অভিযোগ দিয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।’ গৃহায়নে সেলিম শাহনেওয়াজ, অফিস সহকারী শওকত হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে ‘সিন্ডিকেট’-এর যে অভিযোগ প্রচার করা হয়েছে, সেটিও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি। যদিও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সিন্ডিকেট কাজ করছে এবং সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ প্রায়ই নানা সমালোচনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে- এ বিষয়টি খোদ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানও স্বীকার করেন।

এর আগে গত ১৩ জুলাই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই সময় অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। কেউ কেউ ওই বদলির আদেশকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বলেও অভিহিত করেন। যদিও বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় ভালো ইমেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী মনে করেন, এক সময় সেবাগ্রহীতাদের প্লট ও পুনর্বাসন প্লটসংক্রান্ত কাজে দীর্ঘদিন ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হতো। অনিয়মের মাধ্যমে একজনের প্লট অন্যজনকে বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগও ছিল। বর্তমানে এসব অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে পুনর্বাসন প্লটের ক্ষেত্রে অধিকতর যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না। একই সাথে বিশেষ সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রতিষ্ঠানটির তরফ থেকে বিতর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢাকার বাইরে বদলি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা: ফেরদৌসী বেগম নয়া দিগন্তকে বলেন, শাহীনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটির কাছে সেটা যথাযথভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় বিভাগীয় মামলা তুলে নিয়ে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ রহিত করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে কয়েকটি সিন্ডিকেট কাজ করে। তাদের কাছে আমি এক প্রকার জিম্মি। তারা কোনো ভালো কাজ, ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে সহযোগিতা করে না। ওই সিন্ডিকেট ভাঙতে আমি কাজ করছি। অনেকটা সফলও হয়েছি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সেবাগ্রহীতাদের জন্য নিবন্ধন পদ্ধতি সহজ করাসহ বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।