আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষীকে জেরার সময় ‘লিডিং’ ও ‘ওপেন’ প্রশ্ন বিতর্ক ঘিরে বাকযুদ্ধ হয়েছে। শহীদ ফারহান ফাইয়াজ হত্যামামলার দ্বিতীয় সাক্ষী ওয়াসিফ মুনীমকে আসামিপক্ষ থেকে প্রশ্ন করার সময় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিচারকের হস্তক্ষেপে আসামিপক্ষের আপত্তি নথিভুক্ত করেই সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: শফিউল আলম মাহমুদের উপস্থিতিতে এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযুক্ত আসামি সাজ্জাদ হোসেনের পক্ষে জেরা করছিলেন আইনজীবী মো: খাইরুল ইসলাম।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় জেরার মাঝামাঝি সময়ে। আইনজীবী খাইরুল ইসলাম সাক্ষীর কাছে জানতে চান, ঘটনার পর ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে আসামি সাজ্জাদ হোসেনকে দেখা গেছে কি না। জবাবে সাক্ষী ওয়াসিফ মুনীম বলেন, ‘ভাইরাল ভিডিওতে সাজ্জাদ হোসেনকে চাপাতি হাতে দেখেছি।’ তবে এর পরপরই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ করেন, ‘ওই ভিডিওতে ফজলে রাব্বী ও আহাদ হোসেনকেও গুলি করতে দেখা যায়।’
সাক্ষীর এই অতিরিক্ত তথ্যে সাথে সাথে আপত্তি তোলেন ডিফেন্সের অন্য আইনজীবীরা। তাদের দাবি ছিল, প্রশ্নটি যেহেতু করা হয়েছিল নির্দিষ্ট একজন আসামিকে নিয়ে, তাই অন্য আসামিদের নাম নথিতে আসা উচিত নয়। অন্য দিকে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম যুক্তি দেন, জেরার সময় সাক্ষী স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে তথ্য দিয়েছেন, তা আদালতের কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ করাই নিয়ম।
উভয়পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে বিচারক মো: শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, প্রশ্নটি যদি ‘লিডিং কোশ্চেন’ হয়ে থাকে, তবে শুধু সাজ্জাদ হোসেনের নাম যাবে। আর যদি ‘ওপেন কোশ্চেন’ হয়, তবে সাক্ষী যা বলেছেন পুরোটাই রেকর্ডে যাবে। এ সময় প্রসিকিউটর সাত্তার পালোয়ান আদালতকে বলেন, লিডিং কোশ্চেনের উত্তর সাধারণত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এখানে করা প্রশ্নটি ছিল উন্মুক্ত বা ওপেন কোশ্চেন। ফলে সাক্ষী যে উত্তর দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত হওয়াই সঙ্গত। কিন্তু ডিফেন্স পক্ষ অন্য দুই আসামির নাম বাদ দেয়ার দাবিতে অনড় থাকে এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে এ ধরনের প্রশ্ন করার জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচারক মন্তব্য করেন, ‘আইনজীবী তার মক্কেলকে বাঁচাতে যে ধরনের প্রশ্ন প্রয়োজন মনে করবেন, তা করতে পারেন।’
পরবর্তীতে কার্যবিবরণী কীভাবে লিপিবদ্ধ হবে, সে বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী এইচ এম তামীমের পরামর্শ নেন আদালত। তার প্রস্তাব মেনে আপত্তিকৃত অংশের আগে ‘স্বগতঃ’ শব্দ যুক্ত করে শেষপর্যন্ত কার্যবিবরণীতে লেখা হয় ‘ভাইরাল ভিডিওতে আসামি মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেনকে চাপাতি হাতে দেখেছি। স্বগতঃ ফজলে রাব্বী এবং আহাদ হোসেনকে গুলি করতে দেখা গেছে। (ডিফেন্স পক্ষের আপত্তি সহকারে)।’
জেরার সূচনায় সাক্ষীর কল রেকর্ড যাচাইয়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওয়াসিফ মুনীম আদালতকে জানান, ফারহান ফাইয়াজকে হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি নিজের মোবাইল থেকে তার বাবাকে ফোন করেছিলেন এবং আদালতের প্রয়োজনে সেই কল রেকর্ড যাচাই করা হলে তার কোনো আপত্তি নেই।
এর আগে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী রেকর্ডের সময় ওয়াসিফ মুনীম জানান, তিনি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের সহপাঠী ছিলেন। তারা দুজনেই বিজ্ঞান বিভাগে ছিলেন। বর্তমানে তিনি মুগদা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র।
২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা কোটাবিরোধী আন্দোলন করা অবস্থায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা তাদের উপর হামলা চালায়। হামলায় আহত হয়ে অনেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আবার তাদের উপর হামলা চালানো হয়।
পরবর্তীতে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হন। এর প্রেক্ষিতে আমি সিদ্ধান্ত নেই যে আমি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করব।
তিনি বলেন, ১৮ জুলাই সকাল আনুমানিক ৯টায় আমি বাসা থেকে আন্দেলনে যোগ দেয়ার জন্য আসাদ গেইটের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আসাদ গেইটে পৌঁছানের পর আন্দোলনকারী ছাত্রদের দেখে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ধাওয়া করে। পরবর্তীতে বেলা আনুমানিক সাড়ে ১০ টার দিকে আমরা আসাদ গেইটে জড়ো হই।
সেখানে আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করি। কিছুক্ষণ পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আমাদের আবার ধাওয়া করে। পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। আবার আমরা জড়ো হই, আবার পুলিশ এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আক্রমণ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা চলতে থাকে।
পরবর্তীতে বেলা আনুমানিক ১টার দিকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা মারণাস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদেরকে ধাওয়া করতে থাকে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের বিভিন্ন অলিতে-গলিতে ঢুকে পড়ি। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের কোনো এক গলির ফুটপাতে আমি বসে পড়ি। তখন দেখতে পাই যে, ফারহান ফাইয়াজকে চারজন ব্যক্তি তুলে নিয়ে আসছে তাকে রিকশায় উঠানোর জন্য। আমি দাঁড়িয়ে দেখি ফারহান ফাইয়াজের বুকে গুলি লেগেছে এবং তাকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য রিকশায় উঠানো হচ্ছে। ফারহান ফাইয়াজ আমার সহপাঠী ছিল। সেও আন্দোলনে গিয়েছিল। আমি ফারহান ফাইয়াজকে দেখার পর তাকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকি এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার পর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠাই। সে যেহেতু আমার সহপাঠী সেজন্য আমিও অ্যাম্বুলেন্স উঠি এবং তাকে ধানমন্ডিস্থ সিটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাই। ইমার্জেন্সি থেকে তাকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। আইসিইউতে নেয়ার পর ফারহান ফাইয়াজের কাছ থেকে তার আইডি কার্ড পেয়ে আমাকে দেয়া হয়। আইডি কার্ড থেকে আমি তার বাবার ফোন নাম্বার পেয়ে সাথে সাথে কল করে ফারহান ফাইয়াজের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করি। পরবর্তীতে তার বাবা ফারহান ফাইয়াজের মামা ও মামীকে হাসপাতালে পাঠান। তাদের কাছে ফারহান ফাইয়াজের আইডি কার্ড বুঝিয়ে দেই ও ঘটনার বর্ণনা করে আমি বাসায় চলে যাই। পরবর্তীতে জানতে পারি যে, ফারহান ফাইয়াজ শহীদ হয়েছেন।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও, পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে আওয়ামী সন্ত্রাসী শেখ বজলুর রহমান, সেন্টু, আজিজুল হক, যুবলীগের আহাদ হোসেন সোহাগ, ফজলে রাব্বী, ছাত্রলীগের রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, সাজ্জাদ হোসেন এই নির্মম হামলা চালায়। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও বিপ্লব কুমার আইনি ব্যবস্থা না নেয়ায় এই ঘটনা ঘটে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।
এর আগে গত ২৪ জুন প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া।
এ মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট আসামি ২৮ জন। এর মধ্যে গ্রেফতার রয়েছেন চারজন। তারা হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো: ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া ও ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন।
এর আগে, ১০ মে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে ২৮ জনের বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। অভিযোগ গঠনের সময় নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন গ্রেফতার চার আসামি।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নৃশংসতা চালায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আসামিদের উসকানি-প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপস্থিতিতে জুলাই আন্দোলনে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। এতে মাহমুদুর রহমান সৈকত, ফারহান ফাইয়াজসহ ৯ জন নিহত হন। আহত হন আরো অনেকে।



