রাজনীতির নামে একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে

চাঁদপুরের বিভিন্ন সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শাহরাস্তি উপজেলার খোর্দ্দ খাল পুনঃখনন উপলক্ষে খালপাড়ে আয়োজিত সমাবেশে বক্তৃতা করেন   : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শাহরাস্তি উপজেলার খোর্দ্দ খাল পুনঃখনন উপলক্ষে খালপাড়ে আয়োজিত সমাবেশে বক্তৃতা করেন : পিআইডি

চাঁদপুর প্রতিনিধি

দেশে একটি মহল রাজনীতির নামে ‘বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে’ উল্লেখ করে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির নামে যদি কেউ বিভ্রান্ত সৃষ্টি করতে চায়, রাজনীতির নামে যদি কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, আপনারা কি বসে থাকবেন? আমরা কেউ বসে থাকব না।’

গতকাল বিকেলে চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্যে এ কথা বলেন।

সরকারপ্রধান বলেন, দেশের মানুষ চায় স্থিতিশীলতা, দেশের মানুষ চায় শান্তি। কিন্তু কিছু মানুষ, একটি মহল বিভিন্ন বিতর্কের সৃষ্টি করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা দেশের মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, দেশের মানুষ তার পক্ষে রায় দিয়েছে। মানুষকে সাথে নিয়েই বিএনপি সরকার তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজে হাত দিয়েছে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এসব প্রতিশ্রুতি যদি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে দেশে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। বিভ্রান্তি ও অরাজকতার বিরুদ্ধে কেউ বসে থাকবে না, এই বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘কারণ বিএনপি যে সকল কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, প্রত্যেকটি কর্মসূচি হচ্ছে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষের কর্মসূচি।

সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের এই অনুষ্ঠান হয়। চাঁদপুর ছাড়াও আরো ২০টি জেলায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে ১০ জন নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ল্যাপটপের বাটন টিপে চাঁদপুর ও অন্য ২০টি জেলার ১৫ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তার অর্থ (আড়াই হাজার টাকা) হস্তান্তর করেন সরকারপ্রধান।

ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে সামবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, চাঁদপুরে একটি ইপিজেড স্থাপন করা হবে। চাঁদপুর সরকারি কলেজের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস করা হবে। আমরা নির্বাচনের পূর্বে ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এর মাধ্যমে আমরা নারীদের স্বাবলম্বী করতে চাই। এ ছাড়া বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি কৃষক কার্ড, খাল খনন, তরুণ সমাজকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা এবং দেশে তাদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারি, তাহলেই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দেয়া সম্ভব হবে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন- শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, চাঁদপুর-৩ আসনের এমপি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, চাঁদপুর-২ আসনের এমপি ড. জালাল উদ্দিন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি রাশেদা বেগম হীরা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সলিম উল্যাহ সেলিম।

‘অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র রুখবে জনগণ’

বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র রুখে দেবে জনগণ। তিনি বলেন, জনগণ যতক্ষণ সমর্থন দেবে আমরা জনগণের জন্য, দেশের জন্য ইনশা আল্লাহ কাজ করে যাবো। এর থেকে একবিন্দুও এদিক ওদিক হবে না। গতকাল বিকেল পৌনে ৫টায় চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নের কুমারডুলি গ্রামের ঘোষের হাট সংলগ্ন ‘বিশ্ব খাল’ পুনঃখননের উদ্বোধন শেষে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আমরা যখন খাল কাটা শুরু করেছি, আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেয়া শুরু করেছি, যখন ইমাম-মুয়াজ্জিনদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানী ভাতা দেয়া শুরু করেছি, বৃক্ষরোপণ অভিযান শুরু করেছি- তখন কিছুসংখ্যক মানুষ এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর কথা বলছে। এর বিরোধিতা শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘কেউ যদি এই কাজ বাধাগ্রস্ত করতে চায়, আমাদের কিছু করা লাগবে না, বাংলাদেশের মানুষই তাদের সেই পরিকল্পনা অবশ্যই রুখে দেবে। তাই আসুন যে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করলে এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, আমরা সে সকল কাজে নেমে পড়ি।’

দেশ গঠনের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সামনে উদ্দেশ্য লক্ষ্য একটাই। এই দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে, এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হবে এবং সেই কাজ আমরা শুরু করেছি। বিএনপি সবসময় একটি কথা বলে থাকে জনগণই হচ্ছে বিএনপির সকল রাজনৈতিক শক্তির উৎস এবং সেই জন্যই জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা এসব কর্মসূচি শুরু করেছি। জনগণ যতক্ষণ সমর্থন দেবে আমরা জনগণের জন্য কাজ করে যাবো।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলা সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে এসে নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে বিশ্ব খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

‘নারী শিক্ষা ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করা হবে’

সাইফুল ইসলাম সিফাত, হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, জুলাই শহীদদের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘তাদের স্বপ্ন যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাদের মৃত্যুকে যদি মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে আমাদের সকলকে আজ দেশ গঠন বা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হবে।’ শনিবার বিকেলে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের ওয়ারুক বাজার এলাকায় ‘খোর্দ্দ খাল’ পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই এলাকার সাতটা তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। কেন ঝরে গিয়েছিল? সেই সাতটা তাজা প্রাণের দাবি ছিল বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। বিএনপিরই সাতটা প্রাণ ঝরে গিয়েছে বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। এইভাবে সারা বাংলাদেশে শুধু বিএনপিরই শত শত নেতাকর্মী তাদের জীবন দিয়েছেন। শুধু জুলাই-আগস্ট মাসেই আমাদের সারা বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার শ’র মতো নেতাকর্মী সেদিন খুন হয়েছিলেন।

‘খোর্দ্দ খাল’ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪৮ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করে গিয়েছিলেন, তারপরে সময়ের পরিক্রমায় খালটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই খাল শহীদ জিয়া যখন খনন করেছিলেন, তার ফলে এই এলাকার কৃষক ভাইদের সুবিধা হয়েছিল। প্রায় দুই হাজার কৃষক পরিবারের সুবিধা পেয়েছে। ১৩ কিলোমিটার লম্বা খালের সুবিধা বহু মানুষ পাবে, শুধু কৃষক ভাইয়েরা না, খালের দুই পাশে যারা থাকে তারাও পানির সুবিধা পাবে।

নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সেই কর্মসূচিকে আমরা আরো এগিয়ে নিয়ে যাবো এবং ইনশা আল্লাহ আমরা এই যে মেয়েদেরকে শিক্ষাব্যবস্থা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করেছি, এটাকে আমরা ডিগ্রি বা স্নাতক পর্যন্ত ইনশা আল্লাহ ফ্রি করব। শুধু তাই নয়, যে সকল মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে ইনশা আল্লাহ তাদেরকে আমরা উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব।’ বেকারত্ব নিরসনে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা চাই আমাদের দেশের তরুণদেরকে টেকনিক্যাল ট্রেনিং দিতে, যাতে করে তারা দেশে কোনো একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে অথবা নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য তৈরি করতে পারে। যাতে করে দরকার হলে তারা বিদেশেও যেতে পারে এবং বিদেশে যাতে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে।

চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিয়ার মমিনুল হকের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য রাখেন- শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

কুমিল্লা নামে বিভাগ বাস্তবায়নের আশ্বাস

কুমিল্লা থেকে হাবিবুর রহমান চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে হবে। ব্যবসাবাণিজ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ মুক্ত করতে হবে। দেশ পুনর্গঠন একা করা সম্ভব নয়। তাই জনগণ ও সরকার মিলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুর সফরের পথে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠে অনুষ্ঠিত পথসভায় এসব কথা বলেন। এর আগে ২০০১ সালেও এই মাঠে তিনি বক্তব্য রাখেন।

সভায় কুমিল্লা বিভাগ দাবির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুমিল্লা নামে বিভাগ হওয়াটা যদি এই অঞ্চলের জনগণের দাবি হয়ে থাকে তাহলে ইনশা আল্লাহ সেটি বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার মধ্য দিয়ে নিজেদের রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে নির্বাচিত করেছে। বিএনপি অতীতে যেমন দেশের মানুষকে ওয়াদা দিয়েছে, দেশের সেবা করার সুযোগ পেয়ে সে ওয়াদা পূরণ করেছে। ভবিষ্যতেও সব ওয়াদা পূরণ করবে ইনশা আল্লাহ।

পথসভার সভাপতিত্ব করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াছিন, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসক ও কুমিল্লা বিভাগীয় বিএনপির সাংঠনিক সম্পাদক মো: মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু।

আরো বক্তব্য রাখেন- কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক উদবাতুল বারী আবু, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ-সম্পাদক কামরুল হুদা, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আমিরুজ্জামান আমির, সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম প্রমুখ।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা : কুমিল্লার মানুষ কৃষিনির্ভর। তারা কুমিল্লায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি তুলেছেন। আমি শিগগিরই এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে বসব, যাতে যত দ্রুত সম্ভব কুমিল্লায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করা যায়।