নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ১০০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অভিযানের পর শুরু হওয়া এই দীর্ঘ সময়ে উপত্যকাজুড়ে নজিরবিহীন প্রাণহানি, লাগাতার ধ্বংসযজ্ঞ এবং চরম মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৬৬ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো এক লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বিমান হামলা ও কামানের গর্জন তুলনামূলক কমলেও উপত্যকার পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটছে। তথ্য মতে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত আরো অন্তত এক হাজার ৫৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৫০ জনেরও বেশি নারী ও শিশু রয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন তিন হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ।
এ দিকে গত বুধবার জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরাইল যেভাবে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল সম্প্রসারণ করছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবন আরো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্থলভাগের সীমানা স্পষ্ট নয়, সেখানে বেসামরিক মানুষ বেশি হতাহত হচ্ছেন। বর্তমানে গাজার সমস্ত সীমান্ত পারাপারের পথ ইসরাইলি বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকায় বা বন্ধ থাকায় পুরো এলাকা অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ফলে খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না। গত মাসে জাতিসঙ্ঘ জানায়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে গাজার ১৭টি হাসপাতাল এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি, যা চিকিৎসাসেবা স্তব্ধ করে দিয়েছে।
দীর্ঘ এক হাজার দিনের এই যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। লাখ লাখ মানুষ এখন নিরাপদ পানি ও খাবারের তীব্র সঙ্কটের মাঝে বিশাল তাঁবু শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে আবার বাধ্য হয়ে বোমায় বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই আশ্রয় নিয়েছেন। গত বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কার পর গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হলেও পরিস্থিতি দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে। তবে ফিলিস্তিনি বেসামরিক কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইসরাইলি সামরিক সংস্থা ‘কোগাত’ এই খাদ্য সঙ্কটের দাবি প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, গাজায় যে পরিমাণ খাদ্য পাঠানো হচ্ছে তা স্থানীয়দের পুষ্টির চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।
সীমান্তে নতুন ৫ হাজার ইসরাইলির বসতি
এ দিকে গাজা যুদ্ধের এক হাজার দিন পূর্ণ হওয়ার মাথায় উপত্যকার সীমান্তবর্তী ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে আরো পাঁচ হাজার ইসরাইলি নাগরিক এসে বসবাস শুরু করেছেন। ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরাইলে’র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ৭ অক্টোবরের অভিযানের আগে গাজা সীমান্তসংলগ্ন ওই অঞ্চলে প্রায় ৬২ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও বর্তমানে তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা নিজ নিজ আবাসে ফিরে এসেছেন। ইসরাইল সরকার আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই সীমান্তবর্তী এলাকায় এক লাখ ২৪ হাজার মানুষের স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে পুনর্বাসন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং নতুন বাসিন্দাদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক পুনর্বাসনের দায়িত্বে থাকা ইসরাইলের ‘তেকুমা অধিদফতর’ জানিয়েছে, তারা এই সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, মানসিক ট্রমা কাটানোর সহায়তা, কৃষি খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্পকারখানা স্থানান্তরে বিশেষ সুবিধাসহ এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তেলআবিব আশা করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলে জনবসতি বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরো শক্তিশালী হবে।



