পলিথিনের ডাম্পিং জোনে পরিণত হচ্ছে ঢাকা

আবুল কালাম
Printed Edition

নিষিদ্ধ পলিথিনের নতুন ডাম্পিং জোনে পরিণত হচ্ছে ঢাকা। নিষিদ্ধের দুই দশক পরও বন্ধের পরিবর্তে ব্যবহৃত পলিথিন বর্জ্যে বিপর্যস্ত রাজধানী। পরিত্যক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নগরীর ড্রেন, খাল, নদী, ফুটপাত এবং উন্মুক্ত স্থানগুলো এখন পলিথিনের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন দুই থেকে ২.৫ কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়া হয়। এসব পলিথিনের অধিকাংশই পুনর্ব্যবহারের আওতায় আসে না বরং ড্রেন, খাল, নদী এবং উন্মুক্ত স্থানে জমা হয়ে নতুন নতুন বর্জ্যে স্তূপ তৈরি করছে। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ড্রেন ও খালের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক, পরিবেশ অধিদফতর ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, রাজধানীর পলিথিন বর্জ্যরে অনিয়ন্ত্রিত প্রধান ডাম্পিং এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে আমিনবাজার, কামালবাগ, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগনদী।

আমিনবাজারে ঢাকা উত্তর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বর্জ্যরে একটি বড় অংশ ফেলা হয়, যার মধ্যে পলিথিনও রয়েছে।

অন্য দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকা নদীতীর ও খালের পাশে বিপুল পরিমাণ পলিথিন বর্জ্য জমে পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া তুরাগ নদী ও বিভিন্ন খালড্রেনসংলগ্ন এলাকা অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার কারণে এগুলোও কার্যত নতুন ডাম্পিং জোনে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বড় অংশই পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকজাত পণ্য। ২০০৫ সালে রাজধানীতে দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ১৭৮ টন, যা ১৫ বছরের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা শহরে প্রতিদিন ছয় হাজার ৪৬৪ টন গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার ১০ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য। ভাগাড়গুলোর প্লাস্টিক বর্জ্যরে বেশিরভাগই একবার ব্যবহারযোগ্য পাতলা শপিং ব্যাগ, প্যাক, মোড়ক ও বহুস্তরযুক্ত প্লাস্টিক। আর এই বর্জ্যরে ৪৮ শতাংশ ভাগাড়ে যায়, ৩৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়, ১২ শতাংশ জলাশয়ে এবং ৩ শতাংশ ড্রেন ও পরিত্যক্ত এলাকায় ফেলা হয়। ঢাকার বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২২ দশমিক পাঁচ কেজি, যা জাতীয় গড় থেকে অনেক বেশি।

এ ছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মাটিতে, পানিতে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে বাড়ছে। এটি কেবল পানির ও মাটির দূষণ নয়, বরং মানুষের স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁঁকিও বৃদ্ধি করছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এর প্রভাব গুরুতর। মাছ, সামুদ্রিক পাখি এবং অন্যান্য প্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে মারা যাচ্ছে, যা মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে। এ ছাড়া প্লাস্টিকের পণ্য পোড়ানো বা অপব্যবস্থাপনা বাতাসে দূষক গ্যাসের নিঃসরণ ঘটাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ অপরিকল্পিতভাবে ফেলে দেয়া পলিথিন বর্জ্য। এই পরিত্যক্ত পলিথিন শুধু নগর ব্যবস্থাপনাকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

তাদের ভাষ্য, পলিথিনের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এর দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত প্রভাব। মাটিতে ফেলে দেয়া পলিথিন সহজে নষ্ট হয় না। ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয় এবং খাল-নদীতে জমে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করে। অনেক সময় গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণী খাদ্যের সাথে পলিথিন গ্রহণ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে বা মারা যায়।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ বিজ্ঞানী মো: মাহামুদুর রহমান পাপন নয়া দিগন্তকে বলেন, খোলা জায়গায় প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে ডাইঅক্সিনসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মানুষের শরীরে নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁঁকি তৈরি করছে। তাই পলিথিন দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে রাজধানী ঢাকা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ পরিবেশগত সঙ্কটে পড়বে। তাই নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করা, বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।