আইএমএফের সাথে বৈঠক আজ আলোচনায় বেতনকাঠামো

যৌথভাবে ঢাকায় অবস্থান করছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের আলাদা প্রতিনিধিদল

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চালাতে ঢাকায় পৌঁছেছে। সপ্তাহজুড়ে প্রতিনিধিদলটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির রূপরেখা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করবে। এই আলোচনার টেবিলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শনিবার (১১ জুলাই) সকালে আইএমএফের মিশন চিফ এবং এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের ডেপুটি ডিভিশন প্রধান ইভো ক্রজনার ও সংস্থাটির জলবায়ু নীতি বিভাগের সিনিয়র ইকোনমিস্ট সুফাচোল সুফাচালাইয়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে উঠেছেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আগামী ১৬ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ধাপে ধাপে সফর শেষ করে ঢাকা ত্যাগ করবেন।

এ দিকে ঋণ কর্মসূচি ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকির অংশ হিসেবে শনিবার দুপুরে বিশ্বব্যাংকের একটি ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলও ঢাকায় পৌঁছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান নিয়েছে। জ্যেষ্ঠ অপারেশনস অফিসার আন্না হিদালগোর নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খাতের ব্যাংকিং ও সক্ষমতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। আগামী ১৯ জুলাই পর্যন্ত প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশে অবস্থান করবে।

আজ রোববার আইএমএফ প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে। বৈঠকের অংশ হিসেবে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথেও তাদের বিশেষ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে।

সরকার এই নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের মেয়াদে ৪০০ থেকে ৪৪৫ কোটি মার্কিন ডলার পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ সামাল দেয়া এবং সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ঋণ প্রাপ্তির লক্ষ্য নিয়ে গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান।

চিঠিতে আইএমএফকে জানানো হয়, আগের ঋণ কর্মসূচি নেয়ার সময়ের অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতায় এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির রূপান্তর, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন নানা চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার সংস্কার কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যায়নি; বরং দেশের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতি রেখে তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আলোচনার মূল এজেন্ডা

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবারের মিশনে প্রায় সব অর্থনৈতিক সূচক নিয়েই খুঁটিনাটি আলোচনা হবে। সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেওয়া বিভিন্ন করছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংস্কারের অগ্রগতি, কর-ব্যয় হ্রাস এবং আর্থিক খাতের সার্বিক সংস্কার কৌশল বিস্তারিত আলোচনার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ব্যাংক খাতও থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ কমানোর পদক্ষেপ, ব্যাংক পুনর্গঠন ও অবসায়ন কার্যক্রমে অর্থায়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির অগ্রগতি খতিয়ে দেখবে আইএমএফ।

এ ছাড়া রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও সরকারি ঋণ বৃদ্ধির কারণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’সহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে সরকারি ব্যয়ের চিত্র পর্যালোচনা করা হবে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের কার্যকারিতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ কতটুকু দক্ষতার সাথে ব্যয় হচ্ছে সেসব বিষয়েও জবাবদিহি চাইবে প্রতিনিধিদল।

নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে পৃথক মূল্যায়ন

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ওপর একটি আলাদা মূল্যায়ন করবে আইএমএফ। বর্তমানে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা, নতুন নিয়োগের পরিকল্পনা, বিদ্যমান বেতনকাঠামো, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির (ইনক্রিমেন্ট) নীতি এবং নতুন বেতনকাঠামো ও বিভিন্ন ভাতার সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য চাইবে তারা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পর্যালোচনায় স্থান পাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’, জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যকার আর্থিক লেনদেনের পরিসংখ্যান। একই সাথে প্রাকৃতিক গ্যাসে দেয়া ভর্তুকি, পেট্রোবাংলাকে প্রদত্ত সরকারি সাহায্য ও পুরো জ্বালানি খাতের আর্থিক প্রবাহ খতিয়ে দেখা হবে।

ঋণ ব্যবস্থাপনাও আলোচনার আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিকল্পনা, সরকারি গ্যারান্টি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মোট দায়, বৈদেশিক ঋণের কাঠামো, পরিশোধের সময়সূচি, পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং স্বল্প সুদের উন্নয়ন ঋণের সাথে বাণিজ্যিক ঋণের ভারসাম্যের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই বৈঠকগুলোর মাধ্যমে নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য শর্ত ও অগ্রাধিকার নিয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি হবে। এর বিপরীতে সরকারও সম্প্রতি গৃহীত বেশ কিছু অগ্রগতি আইএমএফের কাছে তুলে ধরবে যার মধ্যে রয়েছে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতির আধুনিকায়ন, ব্যাংক রেজোলিউশন ও আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকি, জলবায়ুসংক্রান্ত সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের উদ্যোগ।

পরবর্তী পদক্ষেপ

ঢাকা সফর শেষ করে প্রতিনিধিদলটি ওয়াশিংটনে আইএমএফ সদর দফতরে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভার পর নতুন এই ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত আলোচনার জন্য আরেকটি মিশন ঢাকায় আসতে পারে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০২৩ সালে প্রথম আইএমএফের সাথে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় পেলেও ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পরও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে উভয় পক্ষ এখন আগের কর্মসূচির স্থলাভিষিক্ত করে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে।