অবহেলায় বিলীনের পথে আত্রাইয়ের রোমান ঐতিহ্য

Printed Edition
অবহেলায় বিলীনের পথে আত্রাইয়ের রোমান ঐতিহ্য
অবহেলায় বিলীনের পথে আত্রাইয়ের রোমান ঐতিহ্য

রুহুল আমিন আত্রাই (নওগাঁ)

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভবানীপুর রাজবাড়ী আজও অতীতের গৌরবের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সময়ের নির্মম আঘাত, দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং সংরক্ষণের অভাবে রোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, ছাদের বিভিন্ন অংশ ধসে গেছে, ভেঙে পড়ছে প্রাচীন প্রাচীর। তবু স্থাপনাটির প্রতিটি ইট-পাথর যেন একসময়ের সমৃদ্ধ জমিদারি, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস বহন করছে।

আত্রাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে, আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর তীরঘেঁষা ভবানীপুর বাজারসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত রাজবাড়ীটি স্থানীয়দের কাছে ‘ভবানীপুর জমিদার বাড়ি’ নামে পরিচিত। পারিবারিক ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জমিদার পরিবারের আদি পুরুষ রঘুরামশংকর চৌধুরী নাটোরের মহারাজার অনুমতি নিয়ে ভবানীপুরে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তার উত্তরসূরি গিরিশংকর চৌধুরীর সময় রাজবাড়ীর সম্প্রসারণ ঘটে এবং পরে প্রিয়শংকর চৌধুরীর আমলে শিক্ষা, সড়ক নির্মাণ ও পুকুর খননসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়। তার উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ভবানীপুর জিএস (গিরিশংকর) উচ্চ বিদ্যালয়।

দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য কলকাতায় চলে গেলেও প্রতাপশংকর চৌধুরী ভবানীপুরেই থেকে শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করেন। বর্তমানে তার উত্তরসূরিরা ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের একটি অংশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন।

জমিদার পরিবারের বর্তমান উত্তরসূরি অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, একসময় তাদের প্রায় তিন হাজার বিঘা জমি ছিল। সময়ের সাথে অধিকাংশ সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। এখন অতীতের স্মৃতি হিসেবে টিকে আছে শুধু ভেঙে পড়া রাজবাড়ীটি।

ধ্বংসপ্রায় অবস্থাতেও ভবানীপুর রাজবাড়ীর নান্দনিক স্থাপত্য ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি দেখতে আসেন। তবে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে।

স্থানীয় সমাজসেবক খোরশেদ আলম বলেন, ভবানীপুর রাজবাড়ী কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কার করা গেলে এটি একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সচেতন নাগরিকদের দাবি, ইতিহাসের অমূল্য এই নিদর্শনটি সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার আগেই প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের আওতায় এনে জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় আত্রাইয়ের ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।