অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বেশ কিছুদিন ধারাবাহিক পতনের পর অবশেষে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে দেশের পুঁজিবাজার সূচক। গতকাল সপ্তাহের তৃতীয় কর্মদিবসে এসে দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। তবে দিনের শুরুতে বাজারগুলোতে সূচকের যে আচরণ দেখা যায় শেষ দিকে তা পুরো ধরে রাখতে পারেনি। লেনদেন শুরুর পর সোয়া একঘণ্টার মতো সূচকের আচরণ ছিল বেশ ঊর্ধ্বমুখী। এর পরই সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। তবে এ চাপে খুব বেশি তীব্রতা না থাকলেও দিনশেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি বড় অংশই হারিয়ে বসে দুই বাজার।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল তার পেছনে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভাব যেমন ছিল তেমনি বিভিন্ন মহল থেকে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগও ছিল। কিন্তু সোমবার ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির উত্তরণ সম্পর্কিত যে উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে তাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান পুরো বিষয় নিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় জানান, পুঁজিবাজারের ওপর বিএসইসির পক্ষ থেকে নজরদারির কোনো বাহুল্য এখনো নেই ভবিষ্যতেও থাকবে না। বিএসইসি চায় একটি স্বচ্ছ পুঁজিবাজার যেখানে দেশী-বিদেশী সব ধরনের মানুষ বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারেন। পুঁজিবাজারকে অতি নিয়ন্ত্রণ নয় বিনিয়োগবান্ধব করাই কমিশনের লক্ষ্য।
তাদের মতে, বিএসইসি চেয়ারম্যানের এ আশ^াসের কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব ছিল গতকালের বাজার আচরণে। চেয়ারম্যান তার কমিশনের দায়িত্ব নেয়ার পর বিগত দুই মাসে তাদের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন, যা উপস্থিত অংশীজনদের আশাবাদী করে তোলে যার প্রভাব ছিল মঙ্গলবারের লেনদেনে। তবে তাদের ভাষায় এটাও ঠিক একদিনেই এ আস্থার সঙ্কট কাটবে না। বিএসইসির নেয়া উদ্যোগগুলো একে একে বাস্তবায়ন হলেই তা দৃশ্যমান হবে।
গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্সের ৩৯ দশমিক ২২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। মঙ্গলবার সকালে ৫ হাজার ৫৯৮ দশমিক ০৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬৩৭ দশমিক ৩০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি হয় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৭৯ ও ৫ দশমিক ৯২ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬০ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২৮ দশমিক ৮০ ও ৩৭ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট।
বিনিয়োগকারীরা দিনের বাজার আচরণে কিছুটা স্বস্তি পেলেও তা কয়দিন টিকে থাকবে তা নিয়ে খুবই সন্দিহান। কারণ অতীতেও বাজার সঙ্কট নিরসনে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের সাক্ষী ছিলেন তারা যার ফলাফল খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। তবুও বর্তমান কমিশনের ওপর তারা আস্থা রাখতে চান। আশাবাদী হতে চান, দ্রুত এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী নয়া দিগন্তকে বলেন, দ্রুততম সময়ে বাজারে ভালো তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজস্ব গতিতে চলতে দিলেই বিনিয়োগকারীরা ফের বাজারমুখী হবে। কারণ ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। দিনের লেনদেনের চিত্র তুলে ধরে তারা বলেন, সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও সেই অনুপাতে টার্নওভার ছিল না। কয়েক দিন অবস্থা ভালো থাকলেই বিনিয়োগকারীরা ফের বাজারে ফিরতে আগ্রহী হবেন।
সূচকের উন্নতি ঘটলেও বিভিন্ন খাতে তার উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন দেখা যায়নি। কয়েক দিন ধরে বাজারে যে দরপতন ঘটেছে গতকাল দিনের শুরুতে বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলো তার কিছুটা ফিরে পেলেও দিনশেষে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল খুবই সীমিত। এতে বাজারের মূলধনের খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি একই সাথে বিনিয়োগকারীদের হারানো পুঁজির খুব সামান্যই যোগ হয়েছে দিনের মূল্যস্তরে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার বাজার কেমন যায় তার ওপরই নির্ভর করবে সামনের দিনগুলোর বাজার আচরণ।
ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফিন্যান্স। ৩৪ কোটি ৫ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১ কোটি ৩ লাখ ৭১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকায় ৮৯ লাখ ৮৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বস্ত্র খাতের কোম্পানি সায়হাম টেক্সটাইলস। লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সায়হাম কটন মিলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ব্র্যাক ব্যাংক ও মালেক স্পিনিং।
গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। এদিন মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশটি সিকিউরিটিজের সাতটিই ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। এগুলোর মধ্যে তিনটি ফান্ড জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও পিএইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড প্রতিটিরই মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। শীর্ষ দশের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এআইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রীণ ডেল্টা ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, আইসিবি সোনালী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, তাক্বাফুল ইন্স্যুরেন্স ও আর ডি ফুড।



