কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমানকে দিল্লি বিমানবন্দরে বাধা দেয়ার ঘটনায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবনকুমার বাধেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ঘটনাটিকে ‘অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক ইশরাত জাহান ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার সাথে দিল্লি বিমানবন্দরে যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে, তাতে সরকারের তীব্র অসন্তোষের কথা জানানো হয়।
এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা: জাহেদকে দিল্লি বিমানবন্দরে বাধা দেয়ার ঘটনাকে ‘অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গতকাল থেকে শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নিতে জাহেদ উর রহমান রোববার সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। ওই বৈঠকে তার বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল। ডা: জাহেদ সরকারি পাসপোর্ট না নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন, যাতে সার্ক ভিসা অব্যাহতির স্টিকার ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত যেসব ইউটিউব চ্যানেল নিষিদ্ধ করেছিল, তার মধ্যে জাহেদ উর রহমানের জাহেদ’স টেক নামের চ্যানেলটিও ছিল। ভারত একই সাথে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল।
জাহেদ উর রহমান বিমানবন্দরে দিল্লির ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কাছে পাসপোর্ট দিলে কালো তালিকাভুক্তির সতর্ক বার্তা আসে। এর প্রেক্ষাপটে দিল্লির ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরবর্তী সময়ে ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের হস্তক্ষেপে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে বিষয়টির সুরাহা হলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে দিল্লিতে প্রবেশের অনুমোদন দেয়; কিন্তু ডা: জাহেদ এই হেনস্তায় অপমানিতবোধ করেন। তিনি ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে আইওআরএ’র বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পরবর্র্তী ফ্লাইটে ঢাকা চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। দিল্লি থেকে সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে কলম্বো হয়ে গতকাল সকালে ডা: জাহেদ ঢাকা ফিরেন।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন আইওআরএ’র বৈঠকে তথ্য উপদেষ্টার অংশ নেয়ার বিষয়টি গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল। এ ছাড়া হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার সফরের বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে কথাও বলেছেন। বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সফর নিয়ে আগেভাগে চিঠি দিয়ে ও ফোনে যোগাযোগের পর দিল্লি বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার কারণ বোধগম্য নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতের সিএনএন-নিউজ১৮-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যাটি একটি আপাত প্রশাসনিক ত্রুটি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ডা: জাহেদ উর রহমানের নাম আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংক্রান্ত একটি কালো তালিকা থেকে সরানো হয়েছিল; কিন্তু তা ইমিগ্রেশনের নজরদারির তালিকায় থেকে গিয়েছিল। যার ফলে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার আগমনের পর সতর্ক বার্তা আসে। পরে এই অসঙ্গতি শনাক্ত ও সমাধান করার পর কর্মকর্তারা ডা: জাহেদকে দিল্লি প্রবেশের ছাড়পত্র দেন।
ডা: জাহেদ প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। আর ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় এলেও রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ না করায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেননি।
জাতীয় সংসদে ক্ষোভ
সংসদ প্রতিবেদক জানান, দিল্লির বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার এবং যথাযথ কূটনৈতিক চিঠি থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ঘটনাকে জাতীয় মর্যাদা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সাথে সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় উল্লেখ করে ৩০০ বিধিতে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য মো: সাইফুল আলম খান মিলন।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ দাবি জানান।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, যথাযথ কূটনৈতিক চিঠি দেয়ার পরও কেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে ভারতের বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হলো, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শেষ পর্যন্ত তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলেও অপমানবোধ থেকে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ঘটনার পেছনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সংসদ সদস্য আরো বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তাই জাতীয় সংসদকে এ বিষয়ে অবহিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৩০০ বিধিতে একটি স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়া প্রয়োজন।
তবে স্পিকার তার বক্তব্যকে পয়েন্ট অব অর্ডার হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি বলেন, বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারের আওতায় পড়ে না। তবে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য চাইলে পরে এ বিষয়ে একটি নোটিশ দিতে পারেন। নোটিশ পেলে বিষয়টি বিধি অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।



