নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমান সরকারের সময়ে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার ভাষ্য, প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে টিআইবির প্রতিবেদনকে তিনি মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধাননির্ভর নয় বলে মন্তব্য করে বলেন, সংস্থাটি মূলত পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করে।
গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে দেশব্যাপী আলোচিত তিনটি ঘটনায় দায়িত্ব পালনে কৃতিত্ব দেখানো পুলিশ সদস্যদের পুরস্কার প্রদান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ‘শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন’ এবং ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ নীতিতে বিশ্বাসী। এই নীতির আলোকে পুলিশ বাহিনীকে আরো সেবামুখী ও জনবান্ধব করতে সরকার কাজ করছে। ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং মন্দ কাজের জন্য তিরস্কারের প্রক্রিয়া পুলিশ সদস্যদের আরো কর্তব্যপরায়ণ, আন্তরিক ও ন্যায়নিষ্ঠ হতে উৎসাহিত করবে।
অনুষ্ঠানে তিনটি আলোচিত ঘটনায় মোট ১৫ পুলিশ সদস্যকে সনদ ও আর্থিক পুরস্কার দেয়া হয়। ঘটনাগুলো হলো- পল্লবী থানার শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নৌ পুলিশের বীরত্ব এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ক্লুলেস কিশোরী হত্যাকাণ্ড। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ তহবিল থেকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। এ ছাড়া তিনজন নৌপুলিশ সদস্যকে আইজি ব্যাজ প্রদান করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ ধরনের আয়োজন সচরাচর দেখা যায়নি। সাধারণত রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স বা পুলিশ সদর দফতরের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পদক বা ব্যাজ প্রদান করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের তাৎক্ষণিক মনোবল বাড়ানো এবং নৈতিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনানুগ ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর ভাবমর্যাদা নিয়ে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার সফল হয়েছে। পুলিশ এখন আগের চেয়ে বেশি জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অপরাধচিত্রের তুলনামূলক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং প্রতিটি ক্যাটাগরিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
টিআইবির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয়। তারা মাঠপর্যায়ে কোনো তদন্ত বা বিচার-বিশ্লেষণ না করে শুধু পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করে। তাই ওই প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
মন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেলা পর্যায় থেকে নিয়মিতভাবে প্রকৃত অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে থাকে। সেই তথ্য সন্তোষজনক। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদই মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং কোথাও অসঙ্গতি থাকলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
মামলা তদন্তে সরকারি বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতীয় আর্থিক সক্ষমতা ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে তদন্ত, ময়নাতদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বর্তমান বরাদ্দ হয়তো সম্পূর্ণ পর্যাপ্ত নয়। তবে ভবিষ্যতে তদন্ত কার্যক্রম, ময়নাতদন্ত ও পুলিশি টহল আরো গতিশীল করতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
পলাতক ও শৃঙ্খলাভঙ্গকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কর্মকর্তাদের প্রতি কোনো অনুকম্পা দেখানো হবে না। ইতোমধ্যে আলোচিত কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী একাধিক বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে আইসিটি আইন বা দণ্ডবিধির অধীনে মামলা রয়েছে, তারা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি হবেন। অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, পুলিশ মহাপরিদর্শক মো: আলী হোসেন ফকির, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



