বঙ্গোপসাগরে ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রসীমা জয়ের পরও বঙ্গোপসাগরের বিপুল জ্বালানি সম্পদ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছিল বাংলাদেশ। ভারতের সাথে ২০১২ সালে এবং মিয়ানমারের সাথে ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর দেশটির সামনে যে বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গিয়েছিল, বাস্তবে তা দীর্ঘদিন ধরেই অনাবিষ্কৃত ও অনাবাদি পড়ে ছিল। তবে অবশেষে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশ। গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে সরকার, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, আজ রোববারই আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। একই সাথে পেট্রোবাংলার ওয়েবসাইট ও দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবে। দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। দীর্ঘ সময়সীমা রাখার কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরের ভূতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি মূল্যায়নের পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়াই এর উদ্দেশ্য।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই দরপত্রকে ঘিরে সরকারের ভেতরে যেমন আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আগ্রহের ইঙ্গিত মিলছে। ইতোমধ্যে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট এক্সনমবিল ও শেভরন বাংলাদেশের অফশোর ব্লকগুলো নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। সরকারের প্রত্যাশা, সংশোধিত নীতিমালা ও বিনিয়োগবান্ধব শর্তের কারণে এবার আগের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হবে না।

পিএসসি ২০২৬ : বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ধরনের সংস্কার

নতুন দরপত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’। অতীতের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এই নীতিমালায় একাধিক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও লাভজনক গন্তব্যে পরিণত করা। নতুন পিএসসির অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো অনুসন্ধান পর্যায়ে ব্লক এলাকা ত্যাগের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা। আগে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে অনুসন্ধান চলাকালে ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হতো। এবার তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সাথে বিদেশী কোম্পানিগুলোর ওপর করপোরেট আয়কর পেট্রোবাংলা নিজেই বহন করবে। চুক্তির শুরুতে কোনো সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না এবং অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির ওপর শতভাগ শুল্ক অব্যাহতি থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশী কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা সম্পূর্ণভাবে নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্যাসের মূল্য কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন

অতীতে বিদেশী কোম্পানিগুলোর অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল গ্যাসের কম মূল্য। সেই সমস্যা সমাধানে এবার গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে গ্যাসের দাম নির্ধারিত হতো উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েলের দামের ভিত্তিতে। নতুন কাঠামোয় তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়মানুযায়ী গভীর সমুদ্রের গ্যাসের মূল্য হবে গত তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে একটি ফ্লোর ও সিলিং মূল্যও নির্ধারণ করা হয়েছে; অর্থাৎ ব্রেন্টের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের নিচে নামলেও এবং ১০০ ডলারের ওপরে উঠলেও সেই সীমার মধ্যেই গ্যাসের দাম গণনা করা হবে। প্রতি পাঁচ বছর পর এই কাঠামো পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মূল্য কাঠামো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে। কারণ এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমবে এবং লাভজনকতা বাড়বে।

২৬ ব্লকের বিশাল সম্ভাবনা

পেট্রোবাংলা বঙ্গোপসাগরের মোট ২৬টি ব্লক আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করছে। এর মধ্যে অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লক ‘এসএস-০১’ থেকে ‘এসএস-১১’ এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক ‘ডিএস-০৮’ থেকে ‘ডিএস-২২’ নামে চিহ্নিত। কোম্পানিগুলো এককভাবে অথবা যৌথ উদ্যোগে একাধিক ব্লকের জন্য আবেদন করতে পারবে। একটি দরপত্র দলিল কিনেই একাধিক ব্লকে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা অংশগ্রহণকারীদের ব্যয় কমাবে। পাশাপাশি ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন দু’টি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য যৌথ আবেদনও করা যাবে। সরকার চাইছে, বিশ্বের বড় বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে কাজের সুযোগ দিতে। এর অংশ হিসেবে রোডশো, সংবাদ সম্মেলন, দূতাবাসের মাধ্যমে প্রচারণা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের অফশোর অনুসন্ধানের ইতিহাস খুব সুখকর নয়। ২০১০ সালে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস গভীর সমুদ্রের দু’টি ব্লকে কাজ শুরু করলেও গ্যাসের দাম নিয়ে মতবিরোধের কারণে মাঝপথে সরে যায়। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার স্যান্টোস ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ুও কাজ শেষ না করেই চলে যায়। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি অগভীর সমুদ্রের দু’টি ব্লকে অনুসন্ধান চালালেও শেষ পর্যন্ত তারা বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক দরপত্রে। তখন বিশ্বের ৫৫টি কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত একটি কোম্পানিও চূড়ান্ত দরপত্র জমা দেয়নি। যদিও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডাটা প্যাকেজ কিনে আগ্রহ দেখিয়েছিল। পরে পেট্রোবাংলার তদন্তে উঠে আসে, কম গ্যাস মূল্য, উচ্চ পাইপলাইন ব্যয়, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অতিরিক্ত অংশ প্রদান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছিল। সেই ব্যর্থতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে এবার পিএসসি ২০২৬-এ ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সঙ্কটের মুখোমুখি। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত সচল রাখতে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বঙ্গোপসাগরে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এলএনজি আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে স্থিতিশীলতা আসবে। এ ছাড়া সফল অনুসন্ধান দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ পরিবেশেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। কারণ অফশোর অনুসন্ধান প্রকল্পে সাধারণত কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।

আন্তর্জাতিক প্রচারণার বড় পরিকল্পনা

বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে সরকার এবার আগেভাগেই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রচারণা শুরু করেছে। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক রোডশো, ‘মিট দ্য প্রেস’ আয়োজন, বৈশ্বিক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে বিশেষ যোগাযোগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, আগামী ১ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য-উপাত্তের প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরের ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিতে এই ডাটা প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়

যদিও নতুন দরপত্রকে ঘিরে আশাবাদ রয়েছে, তবুও চ্যালেঞ্জ একেবারে কম নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশও অফশোর বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে এখনো পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি। ফলে সম্ভাব্য মজুদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের অভাব রয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি এখনো বঙ্গোপসাগরের প্রকৃত সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে সরকারের নীতিগত নমনীয়তা, উন্নত মূল্য কাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব কিছু মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরের ২৬ ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, নতুন পিএসসি ২০২৬ আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং বঙ্গোপসাগরের অজানা সম্পদ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাগ্য বদলের নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে কি না।