নিজস্ব সরবরাহ বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যয়বহুল সক্ষমতা বাড়ানোয় নজর

আসছে ২ কার্গো এলএনজি নতুন সরবরাহকারী তালিকাভূক্তির উদ্যোগ

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম

দেশের গ্যাস সঙ্কট নিরসনে বড় ধরনের সুসংবাদ নেই। তবে আগামীকাল মঙ্গলবার ও আগামী শুক্রবার দুই কার্গো এলএনজি আসার সিডিউল নিশ্চিত করেছে পেট্রোবাংলার সূত্র। স্পট মার্কেট থেকে এসব কার্গো ক্রয় করা হয়েছে। নিয়মিত সরবরাহকারীদের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং জরুরি দরপত্রেও দর না পাওয়ায় সঙ্কট সুরাহায় দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। সরকার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে এলএনজির মতো ব্যয়বহুল পথে অগ্রসর হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুরাহায় নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে ঢিমে তালে চলছে এমন অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী তালিকাভুক্তিরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট : পেট্রোবাংলার চলতি বছরে পরিকল্পনায় মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে নিয়মিত সরবরাহকারী কাতার এনার্জি ৪০টি, ওকিউ ১৬টি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং ১২টি, ওকিউ ট্রেডিং এলএলসি চারটি এবং এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং ১৪টি দেয়ার কথা। কিন্তু ইরান যুদ্ধে পাল্টে যায় সব হিসাব। যুদ্ধ শুরুর মাত্র চার দিনের মাথায় কাতার এনাজি ২ মার্চ ২০২৬ ফোর্স মেজার ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে ৪০টি কার্গোর স্থলে ২০টি কার্গো দিতে পারবে বলে জানায়। এর বাইরে ওমানের ওকিউ ট্রেডিং ২০২৬ সালে ১৬টি কার্গো দেয়ার কথা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি ৫ মার্চ ফোর্স মেজার ঘোষণা করলে কার্গো পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং চলতি বছরে ১৪টি কার্গো দেয়ার কথা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি গত ৬ মার্চ ফোর্স মেজার ঘোষণা করে সরবরাহ বন্ধ করে। বাংলাদেশকে তারা জানিয়েছিল, রাস লাফান থেকে এলএনজি সরবরাহ পুনরায় শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা সরবরাহ করতে পারবে না।

এর মধ্যে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট টার্মিনালে রহস্যময় অগ্নিদুর্ঘটনা এবং সৌদি আরামকোর একটি কার্গোতে প্রায় ৬১ হাজার টন এলএনজি মহেশখালীতে আসলেও জাহাজের কমপ্লায়েন্স নিয়ে আপত্তির কারণে সেটি গ্রহণ করা হয়নি। ফলে সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার জরুরি টেন্ডারে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। আগস্টে মোট ৯টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল পেট্রোবাংলার। কিন্তু সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা চারটি জাহাজ আসার কথা থাকলেও কোনোটিই নির্ধারিত সময়ে আসেনি। এ ছাড়া জরুরি টেন্ডারে পাঁচটি কার্গো সংগ্রহের চেষ্টা করলেও দর পাওয়া যায় মাত্র দুই কার্গোর। বাকি তিনটি কার্গো সরবরাহে কোনো প্রতিষ্ঠানই দর দেয়নি। ফলে এলএনজি সরবরাহে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

সূত্রমতে ইতঃপূর্বে স্পট মার্কেট থেকে গড়ে বছরে ৪০টি পর্যন্ত এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করা হলেও চলতি বছরে স্বাভাবিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকেই অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

নতুন সরবরাহকারীর খোঁজে পেট্রোবাংলা

এ দিকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে নতুন সরবরাহকারীর খোঁজ করছে পেট্রোবাংলা। আগ্রহী সরবরাহকারীদের নিকট থেকে আগ্রহপত্র আহবান করেছে তালিকাভুক্তির জন্য। গতকাল রোববার এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পেট্রোবাংলা। সূত্রমতে আগ্রহী সরবরাহকারীরা আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত তালিকাভুক্তির আগ্রহপত্র জমা দিতে পারবেন। সূত্র জানিয়েছে, ইতঃপূর্বে সময়মতো সরবরাহ দিতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এড়িয়ে চলতেই নতুন সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার তালিকাভুক্ত রয়েছে।

ব্যয়বহুল এলএনজি সক্ষমতা বাড়ানোয় মনযোগী!

২০১৮ সাল থেকে গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক রাখতে সরকার ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির দিকে মনোযোগী হয়। অবশ্য অনেকেই বলে থাকেন ভূখণ্ড রাজনৈতিক কারণেও সরকারগুলো সে পথে হেঁটেছে। মহেশখালীতে ৫০০ ও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ খাতে নতুন করে মহেশখালীর কুতুবজোমে আরো একটি ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার ল্যান্ডবেইসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ কাজ চলছে। কিন্তু একই সাথে সঙ্কট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সরকারের মনযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

গ্যাসের চাহিদা বাড়ার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা তিন হাজার ৮২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। আর ১১ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজির জোগানসহ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে তিন হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে এক হাজার ৪১৫ মিলিয়ন ঘনফুট (৪১%), সার শিল্পে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট (৬%), শিল্পে ৯৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট (১৯%), ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৭৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট (১৭%), বাণিজ্যিক খাতে ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট (১%), ডোমেস্টিক খাতে ২৯০ মিলিয়ন ঘনফুট (১১%) এবং সিএনজি স্টেশনে ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট (৫%) চাহিদা রয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ চাহিদা বাড়বে মাত্র ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, তাও আবার শুধুমাত্র ক্যাপটিভ পাওয়ার ও শিল্পখাতে। তথ্য বলছে- ২০৩০ সাল নাগাদ ক্যাপটিভ পাওয়ারে চাহিদা বাড়বে ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট এবং শিল্পখাতে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরকার এক দিকে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শিল্পখাতে বিনিয়োগের জন্য আহবান করছে, পাশাপাশি স্পেশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বিভিন্ন দেশকে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে সেসব জোনের গ্যাসের চাহিদা কি এতটাই সামান্য?

ভুগছে বিদ্যুৎ খাত ও সারকারখানা

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে- বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ দিতে না পারায় ৪২টি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের চাহিদা আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ দেয়া যাচ্ছে ৮৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। আশুগঞ্জ সারকারখানা, যমুনা সারকারখানা এবং চট্টগ্রাম ইউরিয়া সারকারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে গ্যাস সঙ্কটের কারণে।

বিশ্ব বাজারে বাড়ছে এলএনজির দাম

এলএনজি জেকেএমের (জাপান-কোরিয়া মার্কার) তথ্য বলছে- ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় হতে বাড়তে বাড়তে গত মার্চের ১৭ তারিখে ২২ ডলার ৩৫ সেন্টে উঠেছিল প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম। এরপর আস্তে আস্তে তা কমতে থাকে এবং এপ্রিলের ১৭ তারিখ নাগাদ প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ)-এর মূল্য দাঁড়ায় ১৫ ডলার। এরপর ধারাবাহিকভাবেই ওঠা-নামার মধ্যে থাকলেও আর ১৫ ডলারের নিচে নামেনি। গত ২৪ আগস্ট প্রতি এমএমবিডিটিইউর দাম ২৩ ডলার ৫১ সেন্টে পৌঁছে। সর্বশেষ গত ২৮ আগস্ট তা কিছুটা কমে ২৩ ডলার ১৮ সেন্টে স্থির হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে গত ছয় মাসে স্পট মার্কেটে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম বেড়েছে ১১৬.০৮%। সূত্র বলছে- এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ঘনফুটে এক ডলার বাড়লে একটি কার্গোতে সরকারের অতিরিক্ত খরচ পড়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। জরুরি কার্গোর ক্ষেত্রে তা আরো কয়েকগুণ বাড়ছে বলেও সূত্র জানায়।

এ দিকে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাতের কারণে বৈশ্বিক গ্যাস বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত ১২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গানভরের সাথে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুমোদন করে সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হলেও এসব কার্গোর মূল্য প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে জাপান কোরিয়া মার্কার সূচকের সাথে ৮.৭৫ সেন্ট যোগ করে নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে চলতি বছরে পাঁচটি, আগামী বছরে ছয়টি এবং ২০২৮ সালে তিনটি কার্গো সরবরাহ দেয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৮ সালের অবশিষ্ট তিনটি কার্গো এবং ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ১০টি কার্গোর মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউতে মার্কিন হেনরি হাব বেঞ্চমার্কের ১২১% এর সাথে ৫.২০ ডলার যোগ করে নির্ধারণ করা হবে।

নতুন ২ কার্গো এলএনজি আসছে স্পট মার্কেট থেকে

পেট্রোবাংলার একটি সূত্র নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আগামীকাল ১ সেপ্টেম্বর এক্সিলারেট টার্মিনালে এবং ৪ সেপ্টেম্বর সামিট টার্মিনালে পৃথক দু’টি এলএনজি কার্গো ভিড়বে। এর পরবর্তী কোনো জাহাজের সিডিউল জানাতে পারেনি সূত্র। সূত্রমতে এক কার্গো এলএনজি দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ দেয়া হলে তিনদিন চলে। কিন্তু নতুন কার্গো আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা না কাটায় রেশনিং করে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, দু’টি ভাসমান টার্মিনাল হতে ১১ শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়ার কথা থাকলেও গতকাল রোববার তা সাত শ’ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি ছিল এবং আজ তা আরো সামান্য কমতে পারে।