রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান ব্যবসায়ী আধিপত্যকে জাতীয় স্বার্থের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী অধিকাংশ প্রতিনিধিই পেশায় ব্যবসায়ী। হলফনামা ও নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী, বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ১৭৪ জন নিজ পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে বিএনপির বিজয়ী ১৪৫ জন সংসদ সদস্য পেশায় ব্যবসায়ী, যা দলটির মোট বিজয়ীদের ৬৯ শতাংশ। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন বিজয়ীর মধ্যে ২০ জন এবং এনসিপির ছয়জনের মধ্যে দু’জন ব্যবসায়ী। আবার স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী সাত প্রার্থীর পাঁচজনই ব্যবসায়ী, যারা আগে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। অন্য দলগুলোর মধ্যেও দু’জন বিজয়ী সদস্যের মূল পেশা ব্যবসা।
রাজনীতিতে এই ধরনের পেশাগত পরিবর্তনকে চরম সঙ্কট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মঞ্জুরে খোদা বলেন, ‘বাংলাদেশ রাজনীতিতে এক কঠিন সময় পার করছে। রাজনীতি এখন প্রকৃত রাজনীতিকদের হাত থেকে বেরিয়ে আমলা ও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একটি অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে, যা দেশের রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি।’
অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সংসদ ও রাজনীতির মাঠে প্রকৃত রাজনীতিবিদরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছেন। ভবিষ্যৎ সংসদে অন্য কোনো পেশাজীবীদের অস্তিত্ব থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সংসদ ও সংসদের বাইরে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখন ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের হাতে। রাজনৈতিক দলগুলোও নমিনেশনে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দিচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অঢেল সুবিধা ভোগের আশাতেই অনেকে রাজনীতিতে ঝুঁঁকছেন। ফলে এই ধারার প্রতিনিধিদের কাছে জনস্বার্থ রক্ষা পাওয়ার আশা করা কঠিন।’
রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার দিকে নির্দেশ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, ‘সাধারণ নাগরিক অধিকার চর্চার চেয়েও কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসাই এখন রাষ্ট্রের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধায় প্রবেশের সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঠিক এমনটাই ঘটছে।’
এদিকে, নিত্যপণ্যের বাজার ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানা পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও বাজারে কাক্সিক্ষত সফলতা মিলছে না। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংসদে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও কেন অতি মুনাফা ও মজুদদারি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না? সরকারের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও বাজার সহনীয় না হওয়ায় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিনির্ধারণী জায়গায় ব্যবসায়ীদের একক আধিপত্য থাকার কারণেই সরকার চাইলেও ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সংসদে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাড়েনি। দেশে ব্যাপকভাবে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ চলায় বিপুল অর্থের বিনিময়ে ব্যবসায়ীরাই সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে প্রকৃত রাজনীতিবিদরা রাজনীতি থেকে দূরে ছিটকে পড়ছেন। এই বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হওয়ায় ক্ষমতায় আসার পর সরকারি ক্রয়, সরবরাহ ও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে লভ্যাংশ তোলার প্রবণতা তৈরি হয়।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘এর বড় প্রভাব পড়ছে দেশের মূল নীতিকাঠামোতে। ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ কিংবা তৈরী পোশাকের মতো স্পর্শকাতর খাতের নীতিমালা এখন ব্যবসায়ীদের সুবিধার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে। সংসদ সদস্যরা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতের বদলে নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত। ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি স্তরে ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। জনস্বার্থ রক্ষায় এই ক্ষতিকর রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর দায়িত্ব মূল রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি রাষ্ট্রে যার যা কাজ, তার সেটাই করা উচিত। এতে রাষ্ট্র উপকৃত হয়। কিন্তু সব পেশার মানুষের এভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে জড়িয়ে পড়ার কারণে জনস্বার্থ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে এবং নীতিনির্ধারণে তৈরি হচ্ছে স্বার্থের সঙ্ঘাত। বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, এই নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষক, আমলা থেকে শুরু করে নানা পেশার প্রতিনিধিরাই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক বা অনুসারী হিসেবে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করাটাই পদোন্নতির প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনেই সবার আগ্রহ বেশি। সুশীল সমাজের অনেকেই দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে মরিয়া; সবারই লক্ষ্য রাজনীতির আশ্রয়ে বাড়তি সুবিধা হাসিল করা। ফলে রাজনৈতিক সংগঠন আর পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যকার সীমানা মুছে এক জগাখিচুড়ি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে আর্থিক শক্তিকে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরাই রাজনীতির চালকের আসনে বসে পড়ছেন। তাদের ধারণা, রাজনীতি করলে ব্যবসার প্রসার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো দক্ষ ও আদর্শবান কর্মী তৈরি না করে ‘রেডিমেড’ নেতা পাওয়ার সহজ পথ বেছে নেয়ায় পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের পেশাদারিত্ব নষ্ট হচ্ছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে গণতন্ত্রের বিকাশে। সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাজনীতি দখল করায় সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতি সম্পর্কে চরম নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ে বাড়ছে দুর্নীতি, ফলে জনস্বার্থ থেকে যাচ্ছে আড়ালে।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও মেধা ও পেশাগত দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন বন্দী হয়ে আছে। গত ৫৪ বছরে দেশে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যে, ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য ছাড়া একটি ট্রেড লাইসেন্স পাওয়াও দুষ্কর। ফলে সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত নন- এমন ব্যক্তিরাও সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে বাধ্য হন। পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র দলীয়করণের কালো ছায়া নেমে এসেছে; সর্বত্র চলছে ‘নিজের লোক’ খোঁজার রাজনীতি।



