স্বাভাবিক আচরণে ফিরছে পুঁজিবাজার

সক্ষমতা বৃদ্ধির আরো একবার সুযোগ পাচ্ছে আইসিবি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দুর্বল কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য থেকে ধীরে দীরে স্বাভাবিক আচরণে ফিরতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। দেশের দুই পুঁজিবাজারের গত সপ্তাহের লেনদেন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ মুহূর্তে ভালো ও মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের শীর্ষে অবস্থান করছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গতকাল সপ্তাহের লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির ৮০ শতাংশই ছিল মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি। ক’দিন আগেও এ তালিকার ৮০ শতাংশ কোম্পানিই থাকত দুর্বল মৌল ভিত্তির। তবে নানা ধরনের গুজবে প্রভাবিত হয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ উৎপাদন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার নিয়ে টানাহিঁচড়ায় লিপ্ত রয়েছেন।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে চাহিদার তুলনায় শেয়ারের ঘাটতি রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা চাইলেই ভালো শেয়ার পাচ্ছেন না। তাই তারা বিভিন্ন গুজবে প্রভাবিত হন। আর স্বল্পসময়ে বেশি মুনাফার লোভ সবারই থাকে। তবে সম্প্রতি এ প্রবণতা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। বাজার যখন পুরোপুরি স্বাভাবিক আচরণে ফিরবে তখন এসব কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীরা ভালো কোম্পানিতে ফিরে আসবেন। এর জন্য দুই পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও বিএসইসির পক্ষ থেকে লেনদেন স্থগিত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা আরো কার্যকর ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা দরকার।

শুরুতে সংশোধনের মধ্যে থাকলেও গত সপ্তাহের শেষদিকে এসে ইতিবাচক ধারায় ফিরে পুঁজিবাজার। এতে সপ্তাশেষে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৬০ দশমিক ২০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। রোববার ৫ হাজার ৭৪৩ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি গত বৃহস্পতিবার ৫ হাজার ৮০৪ দশমিক ০৬ পয়েন্টে স্থির হয়। এটি গত ২১ মাসের মধ্যে ডিএসই সূচকের সর্বোচ্চ অবস্থান। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বরের পর আর এ পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি সূচকটি। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৭৫ ও ২০ দশমিক ১৮ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনেও যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। এ সময় বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ছয় হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন ছিল পাঁচ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। একই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে বাজারটির মূলধনও। গত সপ্তাহ শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় সাত লাখ তিন হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ছয় হাজার ৯৫ কোটি টাকা বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইর মূলধন ছিল ছয় লাখ ৯৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। বাজার মূলধনের দিক থেকেও এটি ডিএসইর সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর আর এ পর্যায়ে পেঁৗঁছতে পারেনি ডিএসইর বাজার মূলধন।

এ দিকে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়া তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) আরো তিন বছর সময় দিয়েছে সরকার। এর ফলে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে বাড়তি সময় পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই সময় বাড়ানোর সাথে বেশ কয়েকটি কঠোর শর্তও আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আইসিবির ওই সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) জারি করা এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৩ মে থেকে কার্যকরভাবে আইসিবির ঋণের বিপরীতে সরকারের দেয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে বর্ধিত সময়ের মধ্যেই তিন হাজার কোটি টাকার মূল ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে হবে। ঋণচুক্তির অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে। চলতি বছরের মে মাসে ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও আইসিবি তা পরিশোধ করতে পারেনি। তীব্র তারল্য সঙ্কটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন জানায়। সরকারকে করা আবেদনে আইসিবি উল্লেখ করে, এখনই ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হলে তাদের শেয়ারবাজারে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এতে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এফআইডির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য। তাই বর্ধিত সময়জুড়ে আইসিবির শেয়ার কেনাবেচা ও বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পুনর্গঠন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। একই সাথে প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ক্রমবর্ধমান সুদের ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে সৃষ্ট মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি ‘বিজনেস রিকভারি প্ল্যান’ প্রণয়ন করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা দিতে হবে। মন্ত্রণালয় ওই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতিও নিয়মিত পর্যালোচনা করবে।

এ ছাড়া বর্ধিত সময়ের পুরো মেয়াদে প্রতি তিন মাস অন্তর আইসিবিকে তাদের তারল্য পরিস্থিতি, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কার্যক্রম ও ঋণ পরিশোধের প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ প্রতিবেদন অর্থ বিভাগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা দিতে হবে। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে সমন্বয় করে নতুন ঋণ পরিশোধ সূচিও চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।

প্রসঙ্গত, শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে আইসিবি বড় ধরনের মূলধন সঙ্কটে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বাজারে বিনিয়োগ করা প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কমে প্রায় আট হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এতে আইসিবির তহবিলে প্রায় পাঁচ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের বিপরীতে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার সুদও পরিশোধ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একসময় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা করা আইসিবি এখন ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়েছে।

আইসিবির কর্মকর্তারা জানান, আগের বছরগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কমিটির ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং ব্লøক মার্কেটের মাধ্যমে শেয়ার কেনা বন্ধ করা হয়েছে। এখন প্রতিদিন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রতি ১৫ দিন পরপর সেই প্রতিবেদন পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হয়। এতে বিনিয়োগ ক্ষতির গতি কিছুটা কমেছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড এক হাজার ২১৩ কোটি টাকা লোকসানের পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেও আইসিবির লোকসান হয়েছে ৫৮৮ কোটি টাকা। যদিও শেষ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি, তবু পুরো অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।