গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ, রফতানির লক্ষ্য অর্জনে শঙ্কা

শাহ আলম নূর
Printed Edition

গ্যাস সঙ্কট তীব্র হওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক কারখানায় বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত, কাঁচ ও সারসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন কমেছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশী ক্রেতাদের অর্ডার ধরে রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য রফতানি করা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার মেশিন স্বাভাবিক গতিতে চালানো যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার কোথাও দিনের বড় একটি সময় কারখানা বন্ধ থাকছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর পরিস্থিতি বেশি নাজুক। বয়লার, ডাইং, টেক্সটাইল, সিরামিকের কিলন, কাচের ফার্নেসসহ বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিটে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকলে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এর তথ্যে দেখা যায়, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে দেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। একই সাথে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। ডিসিসিআই বলছেন, শিল্প উৎপাদনের এই ক্ষতির পুরোটা সরাসরি জিডিপি ক্ষতি নয়। এর সাথে রফতানি আদেশ বাতিল বা পিছিয়ে যাওয়া, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের বাড়তি খরচ, কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হওয়া এবং যন্ত্রপাতির ক্ষতির মতো পরোক্ষ ক্ষতিও রয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্পও গ্যাস সঙ্কটের কারণে চাপে রয়েছে। কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে বাড়তি এই ব্যয় সবসময় ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার সুযোগও নেই।

তথ্যে দেখা যায়, জুলাই মাসে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম। একই সময়ে ভবিষ্যৎ রফতানি অর্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও কমেছে। রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান গ্যাস সঙ্কট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হবে। এতে বিদেশী ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পে সঙ্কট আরো তীব্র। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এসব কারখানায় বয়লার ও উৎপাদন মেশিন চালাতে না পারায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের অভাবে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ অথবা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। তারা বলছেন, টেক্সটাইল শিল্পের ক্ষতির প্রভাব সরাসরি পোশাক খাতেও পড়ছে। কারণ পোশাক কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় সুতা, কাপড়, ডাইং ও ফিনিশিংয়ের বড় একটি অংশ দেশীয় টেক্সটাইল কারখানা থেকে আসে। এসব কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে পোশাক তৈরির পরবর্তী ধাপেও তার প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে রফতানি পণ্য জাহাজীকরণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে জটিলতা।

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) সভাপতি ময়নুল ইসলাম বলেন, সিরামিক শিল্পেও গ্যাস সঙ্কটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ শিল্পে কিলন বা ফারনান্স নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় চালু রাখতে হয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সাথে ফারনান্স পুনরায় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনতে সময় লাগে। এতে সাময়িক গ্যাস সঙ্কটও অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের উৎপাদন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে একই সাথে ইস্পাত শিল্পেও গ্যাস সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ রিরোলিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। বড় কারখানাগুলোও উৎপাদন কমিয়ে চালাতে বাধ্য হচ্ছে। ইস্পাত উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব নির্মাণ খাতে গিয়ে পড়ে। রড ও অন্যান্য ইস্পাতপণ্যের সরবরাহ কমলে নির্মাণকাজের সময় ও ব্যয় দু’টিই বাড়তে পারে।

এদিকে গ্যাস সঙ্কটে সার উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড বা ঈটঋখ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষতি প্রায় দুই কোটি টাকা বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে চাহিদা পূরণে সার আমদানি বাড়াতে হবে। এতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও বাড়তে পারে।

কাচ বা ফ্লোট গ্লাস শিল্পের ঝুঁকি আরো বড়। এ শিল্পের ফারনান্স দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় চালাতে হয়। গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে ফারনান্স ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বড় একটি ফারনান্স পুনর্নির্মাণ বা প্রতিস্থাপনে শত শত কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে এখানে উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সঙ্কটের সাথে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে গেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়। এরপর শিল্পকারখানায় লোডশেডিং শুরু হলে গ্যাস থাকলেও অনেক সময় উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল বলেন, উৎপাদন সচল রাখতে অনেক শিল্পকারখানা ডিজেল বা অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। একই সাথে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর আবার মেশিন চালু করতে সময় লাগে। ফলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও কমছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। একটি কারখানা কখন পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাবে, তা নিশ্চিত না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন।

বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, রফতানি আদেশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে ক্রেতাদের কাছ থেকে জরিমানা গুনতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতা অর্ডার বাতিল করে দিতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশ থেকে পণ্য নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ঢাকা চেম্বারের তথ্যে দেখা যায়, গ্যাস সংযোগের অভাবে প্রায় ১ হাজার ৮৫৭টি বিনিয়োগ আবেদন আটকে আছে। এসব প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোতেই যেখানে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।