চলতি বছর বাংলাদেশে শীতকালে ঠাণ্ডার প্রকোপটা একটু বেশিই থাকতে পারে। বিশিষ্ট জলবায়ু বিজ্ঞানী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার এএসইউ স্কুল অব সাসটেইনেবল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড দ্য বিল্ট এনভায়রনমেন্টের অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর অধ্যাপক ড. মো: রাশেদ চৌধুরী এ ব্যাপারে নয়া দিগন্তকে অ্যারিজোনা থেকে টেলিফোনিক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির-
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে চলতি শীতের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে আপনি বেশ কয়েকবার বলেছেন, এর পেছনে কোন ফ্যাক্টরগুলো দায়ী?
ড. মো: রাশেদ চৌধুরী : ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শীত অনুভব করেছে এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫-২৬ সালের শীত আরো বেশি ঠাণ্ডা হতে পারে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি) জানিয়েছে, চলতি বছরের শীতে (নভেম্বর ২০২৫ জানুয়ারি ২০২৬) প্রায় ১০টি শীতল হাওয়া বা শৈত্যপ্রবাহ আঘাত হানতে পারে। এর মধ্যে ৪ থেকে ৭টি হালকা থেকে মাঝারি এবং ২ থেকে ৩টি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। শৈত্যপ্রবাহের আওতায় থাকতে পারে দেশের উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব এবং কেন্দ্রীয় অঞ্চল।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, এ বছর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শীত পড়ার সম্ভাবনার পেছনে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরের পর্যালোচনা তুলে ধরলে বুঝতে সহজ হবে। ‘লা নিনা’ হলো একটি জলবায়ুসংক্রান্ত ঘটনা যা মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘটে। এটি ‘এল নিনোর’ বিপরীত এবং বৃহত্তর ‘এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন’ (ইএনএসও) চক্রের অংশ। ‘লা নিনা’ চলাকালে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ঠাণ্ডা হয়ে যায়, অন্য দিকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হয়ে ওঠে। সমুদ্রের এই তাপমাত্রার পার্থক্য বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বিন্যাস এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। এই ‘লা নিনা’ জলবায়ু ঘটনা বাংলাদেশের শীতকে স্বাভাবিকের তুলনায় শীতল করার প্রধান কারণগুলোর একটি। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে, লা নিনার ঘটনা ঘটলে এই প্রক্রিয়াটি তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে শীত আরো কড়া অনুভূত হয়। ‘লা নিনা’ ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে মাঝারি মাত্রায় শুরু হয়েছে এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী এটি ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
নয়া দিগন্ত : ‘লা নিনা’ এবং ‘এল নিনো’ ফ্যাক্টর ছাড়া শীতের মাত্রা বাড়ার পেছনে আর কি কোনো কারণ আছে?
ড. মো: রাশেদ চৌধুরী : জেট স্ট্রিম নামক আরেকটি ফ্যাক্টর আছে বাংলাদেশের শীতের মাত্রা বাড়ানোর পেছনে। জেট স্ট্রিম হলো বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে থাকা একটি দ্রুতগামী ও সংকীর্ণ বাতাসের ধারা। বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের এই বাতাসের ধারা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০১৫ কিলোমিটার (৬৯ মাইল) উচ্চতায় অবস্থান করে। এই বাতাস সাধারণত পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় এবং সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ২০০ মাইল (৩২০ কিলোমিটার) পর্যন্ত অর্জন করতে পারে। জেট স্ট্রিম তখনই তৈরি হয় যখন শীতল ও উষ্ণ বাতাসের বলয় পরস্পর মিলিত হয়, এমনটা ঘটলে তাপমাত্রার তীব্র পার্থক্য গড়ে ওঠে। এই তাপমাত্রার পার্থক্য বাতাসকে দুইটি মণ্ডলের সীমানা বরাবর দ্রুত সরানোর কারণ হয়। জেট স্ট্রিমও এ বছরের অতিরিক্ত শীতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা দেবে। যদিও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শক্তিশালী একটি উপাদান, ‘লা নিনার’ প্রভাবেও এর আচরণ পরিবর্তিত হয়। ‘লা নিনা’র সময় জেট স্ট্রিম সাধারণত দক্ষিণ দিকে সরে আসে, যার ফলে শীতল বায়ু দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করে এবং বাংলাদেশে শীত আরো তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ‘লা নিনা’ ঘটনার কারণে এবং উপরিস্থিত ঠাণ্ডা বাতাস ‘জেট স্ট্রিমে’র সম্মিলিত প্রভাবের ক
নয়া দিগন্ত : লা নিনা এবং জেট স্ট্রিম বায়ুমণ্ডলীয় এই দুই ফ্যাক্টরই এ বছর শীতের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণ, না আরো কিছু আছে?
ড. মো: রাশেদ চৌধুরী : এই দুই কারণ ছাড়াও আরো কমপক্ষে দু’টি ফ্যাক্টর শীত মৌসুমে শীত বেশি হওয়ার পেছনে কাজ করবে। ওই দুটির অন্যতম হলো- ‘ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল’ (আইওডি)। এটি হলো আরেকটি জলবায়ুজনিত ঘটনা, যা ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের পৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রার পার্থক্যকে নির্দেশ করে। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশনের (ইএনএসও) মতো, তবে বিশেষভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব ফেলে। ভারত মহাসাগরের আইওডি বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শীতের জন্য আরেকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আইওডি নেতিবাচক পর্যায়ে থাকলে এটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় শীতল বাতাস নিয়ে আসতে পারে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আইওডি ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে, যার মান ১.৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই ঋণাত্মক আইওডির কারণে পশ্চিম ভারত মহাসাগরে স্বাভাবিকের তুলনায় ঠাণ্ডা পানি বিরাজ করবে, আর পূর্বে উষ্ণ পানি আধিপত্য করবে, যা সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তীব্র শীতল আবহাওয়ার কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে শীত মৌসুমে শীত বাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ঘটে থাকে হিমালয় থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত শীতল বাতাস, এটা প্রায় সারা বছরই ঘটে থা
নয়া দিগন্ত : মেরু অঞ্চলের শীত বায়ু বাংলাদেশের শীতের মাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলে কি না ?
ড. মো: রাশেদ চৌধুরী : হ্যাঁ, বাংলাদেশে শীতের মাত্রা বেশি হওয়ার পেছনে এই মেরু অঞ্চলের বাতাসও প্রভাব বিস্তার করে বিশেষ করে উত্তর মেরুর বাতাস। বর্তমানে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একটি শীতল তরঙ্গ বিরাজ করছে, যা আংশিকভাবে হিমালয় ও তুষারঢাকা পাহাড়ি অঞ্চলের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস দ্বারা সৃষ্ট। তবে আর্কটিক বা উচ্চ-উচ্চতার অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি দক্ষিণের নিম্নভূমি (বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নিচু অঞ্চল) পর্যন্ত পৌঁছানো এই মুহূর্তে সম্ভব মনে হচ্ছে না, কোনো কোনো বছর হয়তো হয়ে থাকে। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ইতিবাচক সঙ্কেত যে, বর্তমানে ঠাণ্ডাটা মূলত উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের ওপরই কেন্দ্রীভূত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, এ বছর শীতের ঠাণ্ডা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অনেক জায়গায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর দিকের রাজ্যগুলো যেমন গ্রেট লেকস, আপার মিডওয়েস্ট, প্যাসিফিক নর্থওয়েস্টে বেশি বৃষ্টি আর তুষারপাত হতে পারে, তাই সেখানে বারবার তুষার পড়া আর লম্বা ঠাণ্ডা দিনের অভিজ্ঞতা হতে পারে বাসিন্দাদের। অন্যদিকে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের এলাকাগুলো, যেমন অ্যারিজোনা, তুলনামূলভাবে বেশি উষ্ণ আর শুষ্ক শীতের মুখোমুখি হতে পারে।



