ব্যাংক লুটেরাদের প্রভাব

খেলাপি ঋণ ৩ মাসে বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশ মন্দ ঋণই ৯৪ শতাংশ

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এক বছর আগে অর্থাৎ গত বছরের মার্চে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

পতিত আওয়ামী লীগ আমলের ব্যাংক লুটেরাদের প্রভাব দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রকট আকার ধারণ করছে। ক্রমন্বয়েই অবনতি হচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এক বছর আগে অর্থাৎ গত বছরের মার্চে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণই বাড়েনি, বেড়েছে মন্দ ঋণের হারও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট খেলাপি ঋণের ৯৪ শতাংশই মন্দ ঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ। মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এসব সূচক দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হতো। প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রদর্শন করা হতো না। এতে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা জানা যেত না। কী পরিমাণ ঝুঁকি আছে তা নিরূপণ করা হতো না। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায় নেয়ার পর প্রকৃত চিত্র বের হয়ে আসছে। এখন প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ হওয়ার পর এ থেকে উত্তোরণের পথ দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত ঋণ, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩০.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা এবং হার বেড়েছে ১.৬৬ শতাংশ। এক বছর আগে ২০২৫ সালের মার্চে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ছিল ২৪.১৩ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ৮.১৩ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

শুধু শ্রেণীকৃত ঋণ নয়, নেট শ্রেণীকৃত ঋণের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রভিশন ও স্থগিত সুদ সমন্বয়ের পর গত মার্চ শেষে নেট শ্রেণীকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১৫.০১ শতাংশ, যা গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৩.৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে নেট শ্রেণীকৃত ঋণের হার ১.০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। ফলে মাত্র এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

প্রভিশন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু সংরক্ষিত প্রভিশনের পরিমাণ মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ঘাটতি আরো ১৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেড়েছে। প্রভিশন কভারেজ অনুপাতও ৫৬.৬০ শতাংশ থেকে কমে ৫৫.৪৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।

ব্যাংক শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক। মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫.৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ তাদের মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকই সমস্যাগ্রস্ত। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩০.১১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ৪০.৭২ শতাংশ এবং বিদেশী ব্যাংকে মাত্র ৪.৮২ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪৫.২১ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে ২৮.৬৩ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৭.৪৭ শতাংশ এবং বিদেশী ব্যাংকে মাত্র ৩.৯৯ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো এখনও উচ্চমাত্রার ঋণঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিশেষ উল্লেখযোগ্য হিসাব বা এসএমএ (ঝঢ়বপরধষ গবহঃরড়হ অপপড়ঁহঃ)-এর পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। মার্চ শেষে এসএমএর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে এ খাতে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। সাধারণত এসএমএ হিসাব ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতে আরো খেলাপিঋণ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করছে।

আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মোট শ্রেণীকৃত ঋণের মধ্যে ৯৩.৬৯ শতাংশই মন্দ ও ক্ষতিজনক ঋণ। অর্থাৎ অধিকাংশ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। মার্চ শেষে মন্দ ও ক্ষতিজনক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

অন্য দিকে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল রয়েছে। এপ্রিল ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা বা ৪.৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ ৫.৫৬ শতাংশ। বিদেশী ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৯২ শতাংশ, যা সবচেয়ে কম।

সামগ্রিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে উচ্চমাত্রার খেলাপিঋণ, ক্রমবর্ধমান প্রভিশন ঘাটতি এবং দুর্বল ঋণমানের কারণে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থার দ্রুত উন্নয়ন না হলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা আরো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। খেলাপিঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ, ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া জোরদার করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দায়ী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করার প্রধান চ্যালেঞ্জ।