নিজস্ব প্রতিবেদক
কুয়াশার ঘনত্ব এবং আওতা কমে এলেও শিগগিরই কমছে না শীতের তীব্রতা। বাংলাদেশের সর্বত্রই শীতের কাঁপুনি এখনো তীব্র। তবে শৈত্যপ্রবাহ গতকাল শুক্রবারের চেয়ে আরো কম অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আজ শনিবার দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। গতকাল তাপমাত্রা নেমেছে ৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানায়। রাজধানী ঢাকার সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ১২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যানবাহনের ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ এবং ইট-পাথরের ভবনের ঢাকায় শীতের যে কাঁপন তাতে উত্তরের রংপুর অথবা রাজশাহী বিভাগের শীতটা কেমন তা বুঝতে পারা যায় সহজেই। শীতের এই দাপটেও কিছু মানুষকে ভোরেই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে হয়। নি¤œ আয়ের এসব মানুষের শরীরে যথেষ্ট গরম কাপড় থাকে না। বড় ধরনের শীতবস্ত্র বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা গেলেও খুবই সীমিত আকারে কিছু বিতরণ হচ্ছে।
পৌষের ঠাণ্ডার সাথে যোগ হয়েছে ৫ থেকে ১২ কিলোমিটার বেগের বাতাস। যে পরিমাণ বাতাস তাতে কুয়াশাকে সরাতে না পারায় শীতকে বেগবান করছে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এত বেশি যে, রাতে তো বটেই দিনের বেলায়ও সব কিছু ভেজা ভেজা লাগে, কাপড় শুকাতে চায় না।
কানাডাপ্রবাসী আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, গতকাল শুক্রবার সকালের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত কুয়াশার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেশের মাত্র ১৫ জেলার উপরে কুয়াশার উপস্থিতি ছিল। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম জেলা, ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলা; চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর জেলার উপরে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশার উপস্থিতি ছিল। আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে রংপুর বিভাগের জেলাগুলো ছাড়া দেশের বেশির ভাগ জেলার উপরে সূর্যের আলো দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্ক্ট ফ্যাকাল্টি ও ইনডিপেনডেন্ট সায়েনটিস্ট জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদ চৌধুরী বাংলাদেশে দীর্ঘ কুয়াশা হওয়ার পেছনের কারণ সম্পর্কে বলেন, হালকা বাতাস কুয়াশা দীর্ঘায়িত করে। রাতে তাপমাত্রা কমে গেলে আর্দ্রতা জমে ভূপৃষ্ঠের কাছে আটকে থেকে কুয়াশায় রূপান্তর করে। এ ছাড়া বাতাসে দূষণের মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা ঘন হয়ে যায়। অপর দিকে দীর্ঘদিন কুয়াশায় আকাশ ঢেকে যাওয়ার আরেকটি কারণ অনাবৃষ্টি। ডিসেম্বর থেকে দেশে বৃষ্টি হচ্ছে না। বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কণা মাটির উপরের স্তরে আটকে থাকছে এবং কুয়াশা হয়ে যাচ্ছে। আবার বৃষ্টি না হওয়ায় বাতাস পরিষ্কার হয় না। ফলে, কুয়াশা শুধু ঠাণ্ডার চেয়ে বেশি স্থায়ী এবং ঘন হয়। আগামী কয়েক দিন সকালে ঘন কুয়াশা থাকতে পারে কিন্তু দুপুরের দিকে সূর্যালোকের তাপ বাড়ায় কুয়াশা কমে আসতে পারে। সামনে প্রায় এক সপ্তাহ চলতি শীতের তীব্রতা থাকতে পারে।
আজ শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। নরসিংদী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া জেলাসহ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। সারাদেশের রাত এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, চলতি মৌসুমে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় সারাদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। আবহাওয়া অফিসের হিসেবে তা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। গত বৃহস্পতিবারও সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। সেদিন দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর গতকাল সারাদিন রোদ থাকায় বিকেলে ৩টায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি মাসে একাধিক শৈতপ্রবাহ বয়ে যাবে এই অঞ্চলের উপর দিয়ে। সেই ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তীব্র শীতে শীতজনিত নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু এবং বয়স্ক মানুষরা। তীব্র ঠাণ্ডায় কাজ করতে না পারায় শ্রমজীবী মানুষ পড়েছে বিপাকে। এই মুহূর্তে শীতবস্ত্রের পাশাপাশি মানুষের খাদ্যসহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। তীব্র শীতে বোরো আবাদ ব্যাহত হতে বসেছে। ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শীতে গবাদি পশুর নানা রোগ বালাই বাড়ছে। ঘটছে প্রাণহানিও।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র আবহাওয়া পর্যবেক্ষক জীতেন্দ্রনাথ রায় জানান, পঞ্চগড় জেলা হিমালয়ের খুব কাছে অবস্থান হওয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্ভর করে উত্তরের হিম বাতাসের ওপর। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা না থাকলেও উত্তরের হিম শীতল বাতাসের কারণে সারা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। আর সকাল থেকে প্রায় সারা দিনই রোদ থাকায় বিকেল ৩টায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ অবস্থা আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি সেল গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৩ লাখ টাকার শীতবস্ত্র সংগ্রহের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে। সমাজের বিত্তবান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক কাজী মো: সায়েমুজ্জামান।



