রফিুকল হায়দার ফরহাদ কানাডা থেকে
‘যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না।’ টরেন্টোর ইউনিয়ন বাস স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে ডেনফোর্থে নামার পরই চোখে পড়ল গাছের সাথে লাগানো বাংলা ভাষায় এই সাইনবোর্ড। বুঝতে বাকি রইল না এই এলাকায় কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের আবাস। মিলনমেলা। আর সাইনবোর্ডের ওই অনুরোধটিই বলে দিচ্ছিল কানাডার টরেন্টোর এই ডেনফোর্থকে কী দশায় রেখেছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এরপর একটি বাংলাদেশী খাবার হোটেলে ঢুকেও সেই বাংলাদেশী চরিত্রের উপস্থিতি। হোটেলের ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ব্যবহৃত টিস্যু। অথচ পাশেই ময়লা ফেলার বিন আছে। ঠিক ওই সাইডবোর্ডটির পাশের অবস্থার মতোই। সাইনবোর্ডের পাশেই বিশাল বড় একটি ময়লা ফেলার বক্স। কিন্তু সেখানে ময়লা না ফেলে আশপাশেই এমনকি ওই সাইন বোর্ডের নিচেই ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা।
৯৯ লাখ ৮৪ হাজার ৬৭০ বর্গ কিলোমিটার বা ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার ১০০ স্কয়ার বর্গ মাইল আয়তনের দেশ কানাডা। এই দেশের অন্যতম জনবহুল এলাকা ওন্টারিও প্রদেশের টরেন্টো। এই প্রদেশেও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা শীতকালে। মাইনাস-৩৫ পর্যন্ত নেমে যায় তাপমাত্রা। উত্তরের প্রদেশগুলোতে আরো ভয়াবহ। কুইবেক প্রদেশে ফরাসিদের দাপট। সেখানে অভিবাসীদের ইংরেজি জানার সাথে ফ্রেঞ্চ ভাষাও জানতে হয়। কারণ ওই কানাডিয়ান ফরাসিরা ইংরেজি জানলেও বলে না। কেউ ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেও উত্তর দেয় না। ভ্যাঙ্কুভারে বাংলাদেশী কম। আবার বেশ ব্যয়বহুল।
তাই বাংলাদেশীসহ অন্য দেশের অভিবাসীদের অতিপ্রিয় এই টরেন্টো। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে অল্প কয়েকজন বাংলাদেশীর আগমন এই কানাডায়। এরপর আশি ও নব্বই এর দশকে অনেক বাংলাদেশী এই দেশে চলে আসে। আর ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কয়েক হাজার বাংলাদেশী আশ্রয় নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে অবস্থিত দেশটিতে। এদের বেশির ভাগেরই অবস্থান টরেন্টোতে। তবে এই দুই বছর আগে আসা বাংলাদেশীরাই পরিবেশটা বেশি নষ্ট করছে টরেন্টোতে। এই অভিযোগ অন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের।
২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরই টরেন্টোতে এসেছিলেন সোহেল আলম। সিলেটে তার ভালো ব্যবসা ছিল। কিন্তু পট পরিবর্তনের পর তিনি কানাডায় এসে এখন উবার চালান। তার গাড়িতে যাত্রী হিসেবে থাকার সময়ই তিনি আফসোস করে বললেন, ‘এখন এমন কিছু বাংলাদেশী কানাডায় এসেছেন এদের জন্য দেশের সম্মানই নষ্ট হচ্ছে। আপনি ড্যানপোর্থে গেলেই দেখবেন পরিবেশটা কী করে রেখেছে।’
প্রবাসী বাংলাদেশীরা নানা সময় মেলার আয়োজন করে টরেন্টোতে। এবার ১ জুলাই বাংলাদেশীদের উদ্যোগে মেলা বসেছিল ডেনটোনিয়া পার্কে। ওই পার্ক এলাকা বাংলাদেশী অধ্যুষিত। কিন্তু মেলা করতে গিয়ে পুরো এলাকাকে পলিথিনসহ নানা আবর্জনা ফেলে একেবারেই নোংরা করে ছেড়েছে। ঠিক বাংলাদেশের ঢাকা শহর বা অন্য এলাকায় মেলা হলে যেমন ময়লা-আবর্জনার স্তূপ হয়ে যায় ডেনটোনিয়া এলাকাকে এই প্রবাসী বাংলাদেশীরা এমন করে ছেড়েছে। এতে কানাডিয়ানরা খুবই অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হয়েছে। তারা এই মেলা শেষের ময়লা-আবর্জনা দিয়ে টিভি এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ করেছে। জানিয়েছেন স্থানীয় অন্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বামপন্থী ছাত্রনেতা আনোয়ার মুকুল অনেক বছর ধরেই টরেন্টোতে আছেন। তার মতে, আগে টরেন্টোর বাংলাদেশীদের এলাকা ভালোই ছিল। রুচিসম্পন্ন মানুষজন থাকত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এমন কিছু বাংলাদেশী এসেছেন তাদের কারণে সেই আগের পরিবেশ আর নেই।’
বাংলাদেশীদের এই নেতিবাচক আচরণের কারণে ড্যানফোর্থ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন সাদা চামড়ার কানাডিয়ানরা। বাড়িঘর বিক্রি করে পাড়ি জমাচ্ছেন তাদের উপযোগী এলাকায়।
ড্যানপোর্থের পদ্মা হোটেলের সামনে ফুটপাতে জিলাপি, পেঁয়াজু, চটপটি ফুসকা বিক্রি করেন বাংলাদেশীরা। সেখানেও নোংরা পরিবেশ। এক দোকানদারকে দেখা গেল টংস ব্যবহার না করে খালি হাতে আরেক ক্রেতাকে সেই জিলাপি দিতে। ঠিক বাংলাদেশে যা হয় আর কি। ওই বাংলাদেশী ক্রেতাও এতে বিরক্ত হলেন না। অবশ্য পাশের আরেক বাংলাদেশী ওই দোকানিকে সতর্ক করলেন এভাবে না দেয়ার জন্য। বাংলাদেশী বাবা-মা এবং নানা-নানী, দাদা-দাদীরা তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনীদের দেশীয় এই খাবার খাওয়ানোর জন্য নিয়ে আসেন। অথচ কানাডায় জন্ম নেয়া এবং লেখাপড়া করা এই উঠতি বাংলাদেশী ছেলেমেয়েরা কিছু অসচেতন বাংলাদেশীদের কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার খাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, ফুটপাথের এই খাবার ঢেকে রাখারও গরজ নেই তাদের। প্রবাসীরা জানিয়েছেন, সাদা চামড়ার কানাডিয়ানরা কোনোভাবেই বাংলাদেশীদের রেস্টুরেন্টে আসেন না।
নতুন আসা বাংলাদেশীদের কেউ উবার চালায়। কেউবা মোটরসাইকেলে খাবার সরবরাহের কাজ করে। এরা সবাই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে থাকছেন। এদের বেশির ভাগই সিলেটের বাসিন্দা। আর যারা উচ্চ শিক্ষিত তারা চাকরি করছেন। কেউবা ব্যবসায় করছেন। লেখাপড়া করতে আসা বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার মামুন জোয়ার্দার টরেন্টোতে বেশ কয়েকটি বাড়ির মালিক। প্রবাসীরা জানিয়েছেন, কানাডায় অবৈধভাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি এখন এই দেশে আছেন। বেশ কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যের ঠিকানা এখন কানাডার টরেন্টোসহ বিভিন্ন শহর। বাংলাদেশের কিছু এলিট খুনীদের দেখা যায় টরেন্টোতে। সুন্দর পরিপাটি পোশাক পরে দামি গাড়িতে তারা ঘুরে বেড়ান।
অথচ বাংলাদেশ সরকার যদি সঠিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষিতদের কানাডায় পাঠাতেন তাহলে দেশের সম্মান বৃদ্ধি। বৈদেশিক মুদ্রাও আরো ব্যাপক হারে বাংলাদেশে যেত।
বিপুলসংখ্যক ভারতীয় আছেন কানাডায়। তবে ভ্যাঙ্কুভারে শিখ নেতা হত্যার সাথে ভারতীয়রা জড়িত থাকায় কানাডা সরকার পছন্দ করে না ভারতীয়দের। এর মধ্যে বেশ কিছু ভারতীয় নিজ দেশের ভুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ছাত্র হিসেবে এসেছে কানাডায়। কানাডিয়ান সরকার তা ধরতে পেরে গণহারে বের করে দিচ্ছে তাদের। বাংলাদেশ সরকার কী আস্থা অর্জন করার এই সুযোগ নিতে পারবে। আর প্রবাসী বাংলাদেশীরা কি তাদের আচার ব্যবহার আরো স্মার্ট করে দেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারবেন।
বাংলাদেশসহ নানান দেশের অভিবাসীর উপস্থিতি এই টরেন্টোতে। বিশ্ব রাজনীতির কারণে কানাডার অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে এই অভিবাসীদের অনেকেই কর্মহীন। এতে চুরিও বেড়েছে। কয়েক দিন আগে টরেন্টোর ড্যানপোর্থের এক দোকানে চুরি হয়েছে। মসজিদ থেকেও জুতা চুরির ঘটনা ঘটছে।
সেই সাথে অনেক নেশাখোরকে নেশা করতে দেখা যাবে টরেন্টোতে। টরেন্টোর ইউনিয়ন বাস স্টেশনের কাছে এ রকম ৮-১০ জন দেখা গেল। গৃহহীন আছেন বহু মানুষ। এরা কাগজে লেখে ভিক্ষা চায়। কখনো ডলার, কখনো সিগারেট, কখনো খাবার চায় তারা। ভিক্ষা না দিলেও তারা রাগ করে না। উল্টো দোয়া করে, ‘সৃষ্টিকর্তা তোমার মঙ্গল করুক।’ কিছু গৃহহীন ইচ্ছে করেই ঘরে থাকে না। সরকারের দেয়া সাহায্য গ্রহণ করে আর মদ গিলে। ঠিক হুইল চেয়ারের মতো গাড়িতে চলাচল করে। সেই গাড়িতে একাধিক মদের বোতল থাকে। তবে ছবি তুলতে গেলে মহাবিপদ।



