নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ইতিবাচক ধারা আরো শক্তিশালী হচ্ছে। সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে লেনদেন শেষ করেছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং কৃত্রিমভাবে দরপতন ঘটানোর নানা অপচেষ্টা থাকলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই সূচকের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পর নিয়মিতভাবে সূচক বৃদ্ধি, বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকা এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। যদিও টাকার অঙ্কে লেনদেন আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে, তবুও বাজারের সামগ্রিক প্রবণতা শক্তিশালী অবস্থানেই রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী চক্র নানা গুজব, কৃত্রিম বিক্রির চাপ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এর ফলে অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন এবং বাজারের ওপর আস্থা হারান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় একই চক্র আবার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের দাবি, গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই বাজার ছিল ইতিবাচক ধারায়। প্রথম ভাগে বেশির ভাগ খাতের শেয়ারদর বাড়তে থাকে এবং সূচক ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে ছিল। তবে মধ্যাহ্নের পর কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারে অস্বাভাবিক বিক্রির চাপ তৈরি করে বাজারের গতি শ্লথ করার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে লেনদেনের গতি কিছুটা কমে গেলেও সার্বিক বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং দিনশেষে সূচক ইতিবাচক অবস্থানেই লেনদেন শেষ করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আচরণ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। গুজব বা সাময়িক চাপে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিচে নামানোর প্রচেষ্টা আগের মতো সহজ হচ্ছে না। তারা মনে করছেন, এই পরিবর্তন বাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
তারা আরো বলেন, পুঁজিবাজারে টেকসই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে। অস্বাভাবিক লেনদেন, কৃত্রিম দর নিয়ন্ত্রণ, গুজব ছড়ানো এবং সঙ্ঘবদ্ধভাবে বাজারে প্রভাব বিস্তারের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সাথে বিনিয়োগকারীদেরও যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গতকাল দিনের লেনদেন শেষে দেখা যায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১২ দশমিক ১০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৭৯৯ দশমিক ৫১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৪ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮৩ দশমিক ১ পয়েন্টে। অন্য দিকে ব্লু-চিপভিত্তিক ডিএসই-৩০ সূচক ১ দশমিক ২০ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৯২ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এ দিকে সূচকের পাশাপাশি বাজারের বিস্তৃত চিত্রও ছিল ইতিবাচক। এদিন ডিএসইতে মোট ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার এবং ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৬টির দর বেড়েছে, ১৫৫টির দর কমেছে এবং ৭১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ দর বৃদ্ধির তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি, যা বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
তবে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে। গতকাল ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৪১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল এক হাজার ৫৩০ কোটি ৭ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে প্রায় ১১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমলেও এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে নেয়ার পরিবর্তে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার ধরে রাখেন। ফলে লেনদেন কমলেও সূচক বাড়তে পারে। বর্তমান বাজারেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
অন্য দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ছিল একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র। গতকাল সিএসইতে মোট ১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। যদিও আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, তারপরও সূচকের ঊর্ধ্বগতি বাজারের ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএসইতে এদিন মোট ২৫৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৩টির দর বেড়েছে, ৯৬টির দর কমেছে এবং ২৫টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ এখানেও দর বৃদ্ধিকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি।
দিন শেষে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬৮ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৪৮৪ দশমিক ৯৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। আগের কার্যদিবসেও সূচক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছিল, যা ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতারই ইঙ্গিত বহন করছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বৃদ্ধি, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
তাদের মতে, পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা জরুরি। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরো নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরতে পারেন। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও বাড়তে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসের লেনদেন দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। বিভিন্ন অপচেষ্টা সত্ত্বেও সূচকের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করছে যে বাজার ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও ইতিবাচক ধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।



