শিক্ষক থাকলেও কাসে নেই শিক্ষার্থীরা

গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হালচাল, বদলি নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে : সচিব

Printed Edition

শাহেদ মতিউর রহমান

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির নিয়মে পরিবর্তন আনছে সরকার। গ্রামের অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কিছু কিছু বিদ্যালয়ে কাসে শিক্ষার্থী না থাকলেও একাধিক শিক্ষক রয়েছেন। তারা মাসে মাসে নিয়মতিভাবে সরকারের কোষাগার থেকে বেতন ভাতাও উত্তোলন করছেন। তবে যেহেতু কাসে শিক্ষার্থী নেই তাই তাদেরকে নিয়মিত স্কুলে যেতে হয় না। আবার উপজেলায় হাজিরা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকায় অনেকে স্কুলে গেলেও ব্যস্ত থাকেন অন্য কাজে।

সম্প্রতি দেশজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালিত পরিসংখ্যানেই এই চিত্র উঠে এসেছে। সূত্র বলছে, দেশজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিার্থী কমছে ধারাবাহিকভাবে। কোথাও একটি শ্রেণীতে শিার্থী পাঁচজন, কোথাও পুরো বিদ্যালয়েই ৩০-৪০ জনের বেশি নেই। অথচ এসব বিদ্যালয়ে শিকসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকায় সরকারের প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হচ্ছে। অন্য দিকে জনবহুল এলাকায় এখনো অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিককে একাধিক শ্রেণী সামলাতে হচ্ছে। ফলে এক দিকে সরকারি অর্থের অদ ব্যবহার, অন্য দিকে শিার কাক্সিত মানও অর্জিত হচ্ছে না।

প্রাথমিক শিা অধিদফতরের (ডিপিই) বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (অচঝঈ) ও সাম্প্রতিক শিা-পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিার্থী উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৩ সালের শুমারি অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিার্থী এক বছরেই ১০ লাখের বেশি কমেছে। সব ধরনের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানে মিলিয়ে শিার্থী কমেছে প্রায় ৮ লাখ ৩২ হাজার। অন্য দিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিকের সংখ্যা এখনো প্রায় তিন লাখ ৬২ হাজার। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে শিক-শিার্থী অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। কোথাও তিন-চারজন শিক মিলে ২০-৩০ জন শিার্থীকে পড়াচ্ছেন। আবার শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি শ্রেণীতে ৫০-৬০ জন শিার্থী নিয়ে একজন শিককে পাঠদান করতে হচ্ছে।

অবশ্য এ বিষয়ে শিা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জন্মহার কমে যাওয়া, শহরমুখী অভিবাসন, ইংরেজি মাধ্যম ও কিন্ডারগার্টেনের প্রতি অভিভাবকদের ঝোঁক এবং গ্রামাঞ্চল থেকে কর্মসংস্থানের জন্য পরিবার স্থানান্তরের কারণে বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিার্থী কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে চর, হাওর, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ডিপিইর কর্মকর্তারা বলছেন, শিক নিয়োগ জাতীয় পর্যায়ে হলেও তাদের বদলি ও পুনর্বিন্যাস (রিডিপ্লয়মেন্ট) সহজ নয়। প্রশাসনিক জটিলতা, স্থানীয় চাহিদা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে শিার্থীহীন বা কম শিার্থী থাকা বিদ্যালয় থেকেও শিক দ্রুত সরানো যায় না। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে শিক কার্যত পূর্ণ বেতন পেলেও তাদের কর্মঘণ্টার বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

শিা অর্থনীতিবিদদের মতে, একজন সহকারী শিকের মাসিক বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সরকারি ব্যয় মিলিয়ে বছরে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। যদি শত শত বিদ্যালয়ে বাস্তব চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত শিক থেকে যায়, তাহলে বছরে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ কয়েক শ’ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। যদিও ডিপিই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আর্থিক হিসাব প্রকাশ করেনি। সর্বশেষ এক পরিসংখ্যানের ডিপিইর বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ও আশপাশের দ্রুত জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখনো শিক সঙ্কট রয়েছে। বিপরীতে উত্তরাঞ্চল, উপকূল ও কিছু গ্রামীণ অঞ্চলের বিদ্যালয়ে শিার্থী কমে যাওয়ায় শিক উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। ফলে একই শিাব্যবস্থার মধ্যে দুই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছেÑ এক দিকে অতিরিক্ত শিক, অন্য দিকে শিকস্বল্পতা। শিাবিদদের মতে, এ বৈষম্য দূর করতে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিার্থী সংখ্যা, শিক অনুপাত ও স্থানীয় জনসংখ্যার তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে শিক পুনর্বিন্যাসের ব্যবস্থা করতে হবে।

এই সঙ্কট সমাধানে সরকারকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, শুধু নতুন শিক নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক পুনর্বিন্যাস। যেমন প্রথম অবস্থায় কম শিার্থী থাকা বিদ্যালয়গুলোকে একীভূত (ঝপযড়ড়ষ ঈড়হংড়ষরফধঃরড়হ) করার সম্ভাব্যতা যাচাই; শিক বদলি নীতিমালা আরো কার্যকর করা; শিার্থীভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা চালু করা; গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিার্থী ফিরিয়ে আনতে মানসম্মত শিা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। অবশ্য এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকও তাদের সাম্প্রতিক প্রাথমিক শিা কর্মসূচিতে শিার্থীভিত্তিক পরিকল্পনা, দ জনবল ব্যবস্থাপনা এবং শেখার মানোন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছে।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিা অধিদফতর বলছে, শিার্থীসংখ্যা, শিক বণ্টন ও বিদ্যালয়ের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেণ করা হচ্ছে। সরকারের ল্য কেবল শিক সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং যেখানে প্রয়োজন সেখানে দতার সাথে জনবল ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ জন্য তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: শাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রাথমিকে শিক্ষকদের বদলি নীতিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত বিশ্লেষণ করে তারপরে শিক্ষকদের বদলির ফাইল সুপারিশ করা হবে। আগে নানা পন্থা বের করে শিক্ষকরা বদলির সুযোগ নিত।এখন সঠিক পন্থায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির নিয়ম চালু করা হচ্ছে।

অন্য দিকে বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাথমিক শিায় ভর্তি হার একসময় উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হলো শিার্থী কমে যাওয়া এবং শিক বণ্টনের অসামঞ্জস্য। বিদ্যালয়ে শিার্থী না থাকলেও শিক রেখে দিলে এক দিকে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার ব্যাহত হয়, অন্য দিকে যেখানে শিক প্রয়োজন সেখানে ঘাটতি থেকেই যায়। তাই শিা খাতে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে এখন সময়োপযোগী শিক পুনর্বিন্যাস, বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বাস্তব চাহিদানির্ভর জনবল ব্যবস্থাপনাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।