কিশোরগঞ্জে ২২০ টন আমন বীজে পোকা, অঙ্কুরোদগম নিয়ে শঙ্কা

Printed Edition
পোকায় ধরা ধান বীজ রিগ্রেডিং করে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে	:  নয়া দিগন্ত
পোকায় ধরা ধান বীজ রিগ্রেডিং করে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত

মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ

  • পোকামুক্ত করতে রিগ্রেডিংয়ের পর প্যাকেটজাত
  • এর আগে ব্রি-ধান ৮৮ বীজে মিশ্রণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন কৃষকরা
  • বীজের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

কিশোরগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ২২০ টন ব্রি ধান-৪৯ জাতের আমন বীজে পোকা ধরার অভিযোগ উঠেছে। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা এসব বীজে জীবিত পোকা ও আক্রান্ত দানার গুঁড়া পাওয়ার পর কৃষক, ডিলার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পোকাযুক্ত বীজ রিগ্রেডিং করে নতুন করে প্যাকেটজাত করা হলেও এর অঙ্কুরোদগম ও উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিতরণসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ ঘটনায় বীজের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন ডিলার। তাদের অভিযোগ, উৎপাদন কেন্দ্রের নিজস্ব উৎপাদিত বীজ হিসেবে সরবরাহ করা হলেও বাস্তবে খোলা বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করে তা বীজ হিসেবে সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগ নাকচ করেছে বিএডিসির উৎপাদন বিভাগ।

বিএডিসির বীজ বিপণন কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ বিতরণ বর্ষে কিশোরগঞ্জ উৎপাদন শাখা থেকে ২২০ টন ব্রি ধান-৪৯ বীজ সরবরাহের কথা রয়েছে। এর মধ্যে গত ৩ জুন ১০ টনের একটি চালান বিপণন শাখায় পৌঁছালে যাচাই-বাছাইয়ের সময় বীজে জীবিত পোকা ও আক্রান্ত দানার গুঁড়া পাওয়া যায়।

পরে বিএডিসির বীজ বিপণন কেন্দ্র থেকে উৎপাদন শাখাকে দ্রুত পোকামুক্ত বীজ সরবরাহের জন্য চিঠি দেয়া হয়। একই সাথে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ডিলাররা ইতোমধ্যে বীজ সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ শুরু করেছেন। এ অবস্থায় পোকাযুক্ত বীজ বিতরণ করা হলে কৃষক ও ডিলার পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বিএডিসির কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের উপপরিচালক (বিপণন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আসা ১০ টন বীজের চালান পরীক্ষা করে পোকা শনাক্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য, স্প্রে ও ফিউমিগেশনের মাধ্যমে পোকা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও দীর্ঘ সময় আক্রান্ত থাকা বীজের অঙ্কুরোদগম ও উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিএডিসি বিপণন শাখার সহকারী উপপরিচালক ফাতেমা নাসরিন বলেন, উৎপাদন শাখা থেকে আসা বীজে জীবিত পোকা পাওয়ায় অনেক ডিলার বীজ নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

এ দিকে নির্ধারিত সময়ে বীজ না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ডিলাররা। কটিয়াদীর ডিলার গোলাম মোস্তফা বলেন, টাকা জমা দিয়ে মেমো কাটার পরও বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। করিমগঞ্জের ডিলার খোরশেদ আলম বলেন, ১ জুন বীজ পাওয়ার কথা থাকলেও এখনো সরবরাহ পাননি। পরে জানতে পারেন, উৎপাদন শাখা থেকে আসা বীজে পোকা রয়েছে।

কটিয়াদীর আরেক ডিলার মাসুম বিল্লাহ বলেন, কৃষকের সারা বছরের প্রধান ফসল উৎপাদনের সাথে উন্নতমানের বীজ সরাসরি জড়িত। কোনোভাবেই নিম্নমানের বা ক্ষতিগ্রস্ত বীজ মাঠপর্যায়ে বিতরণ করা উচিত নয়।

সম্প্রতি সরেজমিন বিএডিসির কিশোরগঞ্জ উৎপাদন শাখার গুদামে গিয়ে দেখা যায়, পোকাযুক্ত বীজ রিগ্রেডিংয়ের পর নতুন করে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। এ সময় কয়েকজন ডিলার অভিযোগ করেন, উৎপাদন কেন্দ্রের নামে সরবরাহ করা সব বীজ চুক্তিভিত্তিক বীজচাষিদের উৎপাদিত নয়। তাদের দাবি, খোলা বাজার থেকে কম দামে ধান সংগ্রহ করে বীজ হিসেবে সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে বীজের প্রকৃত উৎস যাচাইয়ের দাবি জানান তারা।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিএডিসি কিশোরগঞ্জ উৎপাদন শাখার উপপরিচালক মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, বীজে কিছু সমস্যা ছিল। রিগ্রেডিংয়ের মাধ্যমে সেগুলো পোকামুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে প্যাকেটজাত করা বীজের অঙ্কুরোদগমে কোনো সমস্যা হবে না।

এ ঘটনায় কৃষকদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে, কারণ বিগত বোরো মৌসুমে বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি ধান৮৮ বীজ ব্যবহার করে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, তাড়াইল ও বাজিতপুরে ওই বীজের জমিতে একাধিক জাতের ধানের মিশ্রণ দেখা যায়। কোনো ধান আগে পেকে যায়, কোনোটি আধাপাকা থাকে, আবার কোথাও শীষই বের হয়নি। ফলে কৃষকেরা একসঙ্গে ধান কাটতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির শিকার হন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তখন তদন্ত করে ব্রি ধান৮৮ বীজে মিশ্রণের অভিযোগের সত্যতা পায়। বিএডিসিও অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিল।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের জন্য প্রায় ৯০০ টন আমন বীজ বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে ব্রি ধান৪৯ জাতের বীজ রয়েছে ৩১৩ টন, যার ২২০ টন সরবরাহের দায়িত্ব কিশোরগঞ্জ উৎপাদন শাখার।

পরপর দুই মৌসুমে বিএডিসির বীজ নিয়ে অভিযোগ ওঠায় কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগে বীজের গুণগত মান কঠোরভাবে যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।