বিনোদন প্রতিবেদক
শিল্পের যেকোনো শাখায় ফিকশন ও নন-ফিকশনের সীমারেখা নিয়ে খুব একটা মাতামাতি না হলেও, ডকুমেন্টারি বা প্রামাণ্যচিত্রের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি অবধারিতভাবেই চলে আসে। কিছু দিন আগেও ধারণা ছিল, ডকুমেন্টারি মানেই কেবল নন-ফিকশন। তবে বিশ্বজুড়ে ডকুমেন্টারি চর্চার আন্তঃসাংস্কৃতিক প্রভাব এবং উত্তরাধুনিক ধারার কল্যাণে বাংলাদেশেও এখন সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। প্রামাণ্যচিত্র এখন ফিকশন ও নন-ফিকশন উভয় উপাদানের যুগলবন্দি হতে পারে।
এরই এক সার্থক উদাহরণ স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘তিনি’ (২০০৫)। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রযোজনায় এবং নির্ঝরের সুপরিকল্পিত পরিচালনায় এই প্রামাণ্যচিত্রটি ফিকশন ও নন-ফিকশনের এক চমৎকার মিশ্রণ। উপমহাদেশের অন্যতম অগ্রগামী ও সৃজনশীল স্থপতি মাজহারুল ইসলামের (১৯২৩-২০১২) জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ‘তিনি’। এতে শুধু একজন স্থপতির ব্যক্তিগত জীবনই নয়; বরং তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সংস্কারের প্রতি অনীহা, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্কট, আধুনিক স্থাপত্য এবং স্থপতির সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে। একই সাথে প্রামাণ্যচিত্রটি ধারণ করেছে দেশের স্থাপত্যচর্চার বিবর্তন এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে।
মাজহারুল ইসলামের বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবন ও কর্মের দিকে তাকালে তার অবমূল্যায়নের এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৪৬ সালে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর, ১৯৫৩ সালে আমেরিকার ওরিয়ন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার সম্পন্ন করেন তিনি। দেশে ফিরে কাজ শুরু করেন সরকারি প্রকল্প, চারুকলা ইনস্টিটিউট (আর্ট কলেজ) ও পাবলিক লাইব্রেরির। এরপর ১৯৫৬ সালে লন্ডনের স্কুল অব আর্কিটেকচারে এবং ১৯৬০ সালে বিশ্বখ্যাত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্ব নেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর এই বাঙালি কৃতী স্থপতিকে দেশের পুনর্গঠনে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাকে মূল স্রোত থেকে কিছুটা দূরে রাখা হয়েছিল। অথচ পাকিস্তান আমলে দেশপ্রেম ও মানবিক কারণে তিনি ইসলামাবাদে মন্ত্রীদের ৯টি বাড়ি নির্মাণের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। মাজহারুল ইসলাম মনে করতেন, স্বাধীনতার পর ত্রিমাত্রিক ভৌত পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশকে নতুনভাবে সাজানোর যে সুযোগ ছিল, সুসঙ্গত পরিকল্পনার অভাবে তা হাতছাড়া হয়েছে। ফলে আজ নিয়মনীতিহীন আবাসন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ দৃশ্যমান। প্রামাণ্যচিত্রটিতে স্থপতির এই অবমূল্যায়নের সমান্তরালে দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কিংবা নাট্যচর্চায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ, রামেন্দু মজুমদার ও সেলিম-আল দীনের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছে, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন।



