চট্টগ্রাম ব্যুরো
‘এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাও। এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত না জানালে আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা না দিলে রাস্তাঘাটে তোমার বাবা, ভাই আর ছেলে-মেয়েদের সাথে ঘটনা হবে।’ বিদেশী একটি নম্বর থেকে এমন ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকির পর চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে এক প্রবাসীর বাড়ি লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ৫০ লাখ টাকা না দিলে চাঁদার অঙ্ক এক কোটি টাকা করারও হুমকি দেয়া হয়েছে।
সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর মুরাদপুরের হামজারবাগ লেনের ৫ নম্বর রোডে রুনা টাওয়ারের গেট লক্ষ্য করে এ গুলির ঘটনা ঘটে। এতে কেউ হতাহত না হলেও এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার ধরন দেখে পুলিশও বড় সাজ্জাদ গ্রুপের আগের চাঁদাবাজির কায়দার সাথে মিল খুঁজে পেয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোস্তফা স্বপন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বিদেশী নম্বর থেকে চাঁদার হুমকি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রুনা টাওয়ারের মালিক হাজী ইউসুফের ছেলে মো: শওকত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বসবাস করেন। ঘটনার একদিন আগে বিদেশী একটি নম্বর থেকে শওকতের মোবাইলে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
প্রায় দুই মিনিটের ওই ভয়েস মেসেজে শওকত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকার দাবি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা কোথায় থাকেন, কোথায় বিয়ে হয়েছে, কোথায় ভবন রয়েছে, কোন ভবনের কাজ চলছে, সন্তানরা কোথায় পড়াশোনা করে, এসব তথ্য জানার কথা উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানো হয়।
মেসেজে বলা হয়, ৫০ লাখ টাকা দিলে ‘নিরাপদে’ থাকা যাবে। অন্যথায় পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা হবে। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। টাকা না দিলে ‘ছেলেদের’ পাঠিয়ে গুলি করার হুমকিও দেয়া হয়।
অন্য একটি ভয়েস মেসেজে বলা হয়, হামলার প্রয়োজন হলে ৫০ লাখের পরিবর্তে এক কোটি টাকা দিতে হবে। কথিত ‘বড় ভাইয়ের’ সাথে যোগাযোগ করতেও বলা হয়।
বিদ্যুৎ ছিল না, সিসিটিভিও নষ্ট
পুলিশ জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি রুনা টাওয়ারের নিচে গিয়ে দারোয়ানের কাছে বাড়ির মালিকের কথা জানতে চান। এরপর তারা ভবনের মূল গেট লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়েন। পরে হেঁটে গলি দিয়ে চলে যান।
ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। একই সাথে ভবনের প্রধান গেটে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাটিও নষ্ট ছিল। ফলে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হচ্ছে।
ডিসি হাসান মোস্তফা বলেন, ‘আগের বড় সাজ্জাদ গ্রুপের মতোই একই কায়দায় হুমকি এসেছে, ধরন একই। বিদেশী নম্বরের মতো মনে হয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি আরো নিশ্চিত হতে চাই। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’
তিনি জানান, গুলির ধরন দেখে পিস্তলের গুলি বলে মনে হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় মামলা করতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।
গ্রুপের সদস্যরা এখনো সক্রিয়
প্রবাসীর বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী চক্র বড় সাজ্জাদ গ্রুপ। তালিকাভুক্ত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গত ৩০ জুলাই ভারতে পালানোর সময় গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির অনেক সদস্য এখনো পলাতক।
এর আগে গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের কার্যালয়ে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছিল, ওই ঘটনার আগে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছে এককালীন এক কোটি টাকা এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ডেভিড ইমনের নাম আসে।
ডেভিড ইমনকে গ্রেফতারের পর চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছিলেন, বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অনেক সদস্য এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রুপটির অন্যতম কথিত শুটার রায়হান আলমও পলাতক রয়েছেন।
এ ছাড়া গত ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবিতে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে দুই দফা হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনাতেও বড় সাজ্জাদের নাম সামনে আসে।
পরপর এসব ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের পরিবারের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে হুমকি দেয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বাড়তি সতর্কতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ রুনা টাওয়ারে গুলির ঘটনায় বড় সাজ্জাদ চক্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে, নাকি তাদের কায়দা ব্যবহার করে নতুন কোনো চক্র সক্রিয় হয়েছে, এখন সেটিই রুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।



