ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের যুক্তি; ফোনকলের রেকর্ড উপস্থাপন

গণ-অভ্যুত্থানের সময় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করা ছিল অপরাধ

আলমগীর কবির
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একটি পরিকল্পিত অপরাধ ছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুক্তি তুলে ধরেছেন প্রসিকিউশন। আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ‘জামায়াত-শিবির’ ট্যাগ লাগিয়ে গণগ্রেফতার ও নির্যাতন বৈধ করতেই এই বেআইনি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে রোববার ছিল প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তৃতীয় দিন। প্রসিকিউটর তামীম আদালতকে জানান, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। তার আমলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল অব: জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষের ফোনকল বেআইনিভাবে নজরদারি ও রেকর্ড করা হতো। সেই এনটিএমসির উদ্ধার করা ডিজিটাল আলামত ও ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত কল রেকর্ডগুলো গতকাল ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়।

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের পেছনের ফোনালাপ

আদালতে উপস্থাপিত ২০২৪ সালের ৩১ জুলাইয়ের একটি ফোনালাপে তৎকালীন যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মধ্যে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের ফাইল প্রসেস নিয়ে কথোপকথন হয় :

ওবায়দুল কাদের : ডিসিশন কবে?

আসাদুজ্জামান খান কামাল : আমি তো এখন ফাইল পাঠাচ্ছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমতির জন্য। আসলেই তারপরই হবে আর কি।

ওবায়দুল কাদের : আজকে দেয়া যাবে?

আসাদুজ্জামান খান কামাল : আশা করি ওটা ওখান থেকে আসলে আমরা করতে পারব। এখন উনি কখন সাইন করবেন।

ওবায়দুল কাদের : আমরা একটা র‌্যালি করতে চাইছিলাম।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : আচ্ছা।

ওবায়দুল কাদের : কাল না করে শুক্রবারে করব ঢাকায়।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : করেন করেন করেন। এইটা এইটা আচ্ছা ঠিক আছে।

ওবায়দুল কাদের : ঢাকার বাইরেরটা কালকে।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : আচ্ছা। ঠিক আছে এখন এখনো হ্যাঁ।

ওবায়দুল কাদের : বৃহস্পতিবারটা করতে চাই না। কারণ যানজট যানজট পরিস্থিতি।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : জি। জি। জি।

ওবায়দুল কাদের : আর বিভিন্ন স্পটে লোকজন ব্যস্ত।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : জি।

ওবায়দুল কাদের : আচ্ছা আরেকটা বিষয়।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : জি।

ওবায়দুল কাদের : হারুনকে কি সরায়ে দিচ্ছেন?

আসাদুজ্জামান খান কামাল : উনি তো খুব এডামেন্ট। আমরা সরাই নাই। ওই ইয়ের আছে ডিএমপিতেই রাখতেছে। উনি বলছিলেন অন্যখানে দিতে আমি ডিএমপিতেই রেখে দিছি। তার শুধু তার মানে ড্রেসটা পরিবর্তন করে দিচ্ছি।

ওবায়দুল কাদের : এখানে তো...

আসাদুজ্জামান খান কামাল : একটা ডিমোরালাইজ হয়ে যাবে আমার পুলিশ। সেটা তেমন কি? ডিমোরালাইজ হয়ে যাবে।

ওবায়দুল কাদের : এতগুলো এই যে আমাদের এত পানি আসছে তো কিছু অ্যারেস্ট করার পর...

আসাদুজ্জামান খান কামাল : রাইট।

ওবায়দুল কাদের : সেটা তো...।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : এটা আপনি একটু আপনি একটু বলেন। আমি তো বলতে বলতে আমি টায়ার্ড হয়ে গেছি। আপনি একটু না বললে আমি আমি আর সাহস পাচ্ছি না।

ওবায়দুল কাদের : একটু ওয়েট করেন।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : আচ্ছা।

ওবায়দুল কাদের : একটা শো করে সে কিছু কাজ করছে এবং আপনার পুলিশ ফোর্স তো ডিমোরালাইজড হইছে।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : সব ডিমোরালাইজড হয়ে যাবে। সেটায় আমি আমিও তাহলে ও দিয়ে কাজ করাইতে পারতেছি না। আমি তো সেটাই চাচ্ছি। সেটাই বলছি।

ওবায়দুল কাদের : এখন আপনি যা ফিল করেন...।

আসাদুজ্জামান খান কামাল : হ্যাঁ।

ওবায়দুল কাদের : এটা আপনি দয়া করে আমাদের সাথে বলতেছেন এটা আপনি নেত্রীকে বলে দিবেন।

ইন্টারনেট শাটডাউন ও বিশ্বজুড়ে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দেয়ার চক্রান্ত

প্রসিকিউটর তামীম বিচারিক প্যানেলকে জানান, শুধু জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধই নয়, ১৬ জুলাই দেশের ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল রাজনৈতিক নির্দেশে। ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের মধ্যে ফোনালাপটি দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়েছে :

পলক : ভাই, আসসালামু আলাইকুম। ভাই, আসসালামু আলাইকুম। জি, আসসালামু আলাইকুম ভাই। পলক বলছি।

কাদের : নেটটা একটু স্লো করে দাও।

পলক : জি।

কাদের : ইন্টারনেট।

পলক : একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়ে নিই?

কাদের : নিয়ে নাও।

পলক : আচ্ছা, ঠিক আছে। জি, আচ্ছা ঠিক আছে।

কাদের : অনেকে আমাকে বলতেছে তো বিষয়গুলো...

পলক : হ্যাঁ, একটু ওই যে মানে বলা আছে তো যে উনি না বললে... মানে...

কাদের : না না, উনাকে জিজ্ঞেস করেই বলবা।

পলক : আচ্ছা, ঠিক আছে। জি। জি স্যার, জি স্যার। জি, আসসালামু আলাইকুম।

প্রসিকিউটর বলেন, এ ফোনালাপের পরই ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্লক করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন অনুযায়ী ‘সিস্টেম ক্রাইম’-এর স্পষ্ট আলামত। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও শেখ হাসিনার ফোনালাপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করতে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ ও ‘বিএনপি-জামায়াত’ হিসেবে ট্যাগ দেয়ার নীলনকশাও প্রকাশ পায়। শেখ হাসিনা ফোনকলে তার কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দিতে।

চট্টগ্রামে গোলাগুলি ও লাশ নিয়ে রাজনীতির চক্রান্ত

আদালতে শুনানো আরেকটি ফোনালাপে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা ও একজন নিহতের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ‘ইস্যু’ বানানোর ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়। ওবায়দুল কাদের, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের সেই ফোনালাপ :

ওবায়দুল কাদের : হ্যালো, নাছির কী করতেছে?

নাছির : জি ভাই, কাল থেকে তো ফাইট করছি। আজকেও তো ওই ইয়া না, সারা দিনই মারামারি। এখনো চলছে।

ওবায়দুল কাদের : ইউনিভার্সিটি কি ওই শিবিরের...?

নাছির : না, বিশ্ববিদ্যালয় গেছে না না না না... বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি একদম নিয়ন্ত্রণে আছে। ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ববিদ্যালয় না। ওখান থেকে এখন টাউনে...।

ওবায়দুল কাদের : ইউনিভার্সিটি, চিটাগং কলেজ...?

নাছির : না না, এগুলো সব নিয়ন্ত্রণে। টাউনের ছোট একটা জায়গায় মুরাদপুর। ওদের সঙ্গে ফাইট হচ্ছে। ওরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আইসা ওখানে গত প্রায় ২টা থেকে শুরু হইয়া এখনো পর্যন্ত চলছে। ওইখানে...।

ওবায়দুল কাদের : ওটা মুরাদপুর এক জায়গায়?

নাছির : মুরাদপুর একটা জায়গায়, একটা জায়গায়...। ছোট্ট একটা জায়গায়। ওইখানে ওই একপাশে ওরা...। আর আর পুরো চট্টগ্রাম পুরো কন্ট্রোলে। পুরো চট্টগ্রাম একদম ইউনিভার্সিটি...।

ওবায়দুল কাদের : আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি... কথা বলো।

নাছির : আমি একদম দিচ্ছি। নিশ্চিন্তে থাকেন, ১০০ ভাগ নিশ্চিন্তে থাকেন। ইনশা আল্লাহ।

(এরপর লাইনে যুক্ত হন জাহাঙ্গীর কবির নানক)

জাহাঙ্গীর কবির নানক : হ্যাঁ, নাছির?

নাছির : জি জি, স্লামালাইকুম।

জাহাঙ্গীর কবির নানক : কী অবস্থা?

নাছির : আমাদের এখানে পুরোপুরি ঠিক আছে। পুরো চট্টগ্রামে শুধু মুরাদপুর একটা জায়গায়, একটা জায়গায় শিবির ওই দিকে একটা অবস্থান নিছে। ওরা ওই খানে ফাইট হয়ে এই পর্যন্ত তিনজন মারা গেছে। বুঝছেন? ওই খানে গোলাগুলি চলতেছে।

জাহাঙ্গীর কবির নানক : তিনজন কারা? কারা মারা গেল?

নাছির : পথচারী আছে, ওদের একজন আছে, আমাদেরও একজন আছে। আর প্রচুর ইনজিউরি হইছে। প্রচুর ইনজিউরড হইছে। বুঝছেন না? প্রচুর দুই পক্ষেরই হইছে ওইখানে। ওইখানে আমরা একপাশে আছি। মুরাদপুরে একপাশে, মোড়ের ওপাশে ওরা, এইপাশে...।

জাহাঙ্গীর কবির নানক : নাছির ভাই?

নাছির : জি জি জি।

জাহাঙ্গীর কবির নানক : আমাদের যেটা মারা গেছে, সেটার জানাজা-টানাজা করেন। ওইটাকে ইস্যু করেন।

নাছির : ওইটাকে একটু ইস্যু করার চেষ্টা করতেছি। ওইটা এখন মেডিক্যালে পাঠাইছে। ওইটা কনফার্ম করে, কনফার্ম করে তারপর ইয়া করবে।

জাহাঙ্গীর কবির নানক : ওইটাকে ইস্যু করেন, ওইটাকে ইস্যু করেন, হ্যাঁ? বি অ্যালার্ট, ওদের কিন্তু খুব খারাপ মতলব। বি অ্যালার্ট।

নাছির : হ্যাঁ, আর আর আর একটা বলি- আর সব পুরো একদম ১০০ পার্সেন্ট। ভার্সিটি থেকে আমি মানা করে দিছি যে, তোমরা ওখানেই থাকো। ভার্সিটি সব দিকে ঠিক আছে। ঠিক আছে, ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে, একদম ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে, ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রণে। আর চট্টগ্রাম শহরের সব জায়গায়, একটা জায়গায় ছোট্ট একটা জায়গায়...।

জাহাঙ্গীর কবির নানক : আচ্ছা থ্যাংক ইউ... থ্যাংক ইউ... থ্যাংক ইউ...।

নাছির : থ্যাংক ইউ।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামিরা হলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

প্রসিকিউটর তামিম আদালতকে জানান, সিআইডির ডিজিটালি ভেরিফাইড মোট ১৪টি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আর দুই দিন সময় নেয়া হবে। এরপর ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা পলাতক আসামিদের পক্ষে তাদের আইনগত অবস্থান ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করবেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট জামায়াত-শিবিরসহ অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। ওই বছরের ২৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও এর সব অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে সরকার।

ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেহেতু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং উহার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ উহার সব অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাস ও সহিংসতায় সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নাই; এবং যেহেতু সরকার বিশ্বাস করে যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং উহার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ উহার সব অঙ্গসংগঠন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সাথে জড়িত নহে’ তাই দলটির নিষিদ্ধ ঘোষণাসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হলো।