ছাতকে অবৈধ চুনের ভাটায় বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

Printed Edition

আমিনুল ইসলাম হিরন ছাতক (সুনামগঞ্জ)

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় চুনাপাথর পুড়িয়ে চুন উৎপাদন একটি সাধারণ শিল্পকার্যক্রম মনে হলেও বাস্তবে তা ভয়াবহ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা শতাধিক চুনের ভাটার কারণে দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে পুরো ছাতক অঞ্চল। চুন উৎপাদনের সময় বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফারযুক্ত বিষাক্ত ধোঁয়া ও সাদা চুনের ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ফসল, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসজনিত রোগ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ব্যবহার করায় দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে এলাকার সবুজ প্রকৃতি। প্রতিটি ভাটার আশপাশে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ও ডালপালা স্তূপ করে রাখা রয়েছে, যা পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। বর্তমানে ছাতকজুড়ে ১০০ থেকে ১২০টির মতো চুনের ভাটা সক্রিয় রয়েছে, যেখানে এক বছর আগেও এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ থেকে ২০টি। স্থানীয়ভাবে ‘চুন পাজু’ নামে পরিচিত এসব ভাটা কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসরণ না করেই গড়ে উঠেছে। শুধু সড়কের পাশেই নয়, গ্রামীণ বসতবাড়ির ভেতরে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গা ঘেঁষেও এসব ভাটা স্থাপন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাতক এখন কার্যত একটি অঘোষিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব ও ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। অবৈজ্ঞানিক চুল্লি থেকে নির্গত ফ্লাই-অ্যাশ ও বিষাক্ত ধোঁয়া দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অবৈধ চুনের ভাটার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসন অনেকাংশে নীরব ভূমিকা পালন করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রতিবাদ করলে জীবন ও জীবিকার হুমকির মুখে পড়তে হয়। ফলে বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যেই দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

চুন ব্যবসায়ী ও পাজু মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে ছাতকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি ভাটা রয়েছে। প্রতিটি ভাটা থেকে মাসে ৫০০ থেকে এক হাজার মণ চুন উৎপাদন করা হয়। গ্যাস সংযোগ না থাকায় কাঠভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার করে এ ব্যবসা তুলনামূলকভাবে লাভজনক হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি। এই ব্যবসা নির্বিঘেœ পরিচালনার জন্য ‘পাজু কমিটি’ নামে একটি সংগঠনও গড়ে উঠেছে।