সিএনবিসি
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিা নিয়ে নিজেদের সামরিক ও প্রতিরা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে ইউরোপ। মহাদেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন চলে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইওয়ালা ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রতিরা খাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ এখন এ প্রযুক্তিতেই গিয়ে মিশছে।
সামরিক কৌশলের এই দ্রুত পরিবর্তনের গতিকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে দুই সপ্তাহের বেশ কিছু বড় ঘোষণা। ড্রোনের সুরায় নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট ন্যাটো, যেখানে যুক্তরাজ্য ড্রোন ও ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থার জন্য শত কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করেছে। ইউক্রেনের জন্য জার্মানি ৫০ হাজার ড্রোন সংগ্রহের পদপে নিয়েছে এবং প্রতিরা প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ ‘হেলসিং’ এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার পেয়েছে। এসব ঘটনা সামরিক পরিকল্পনার বড় ধরনের পটপরিবর্তনেরই ইঙ্গিত করে। যুদ্ধেেত্র ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন ব্যবস্থা একসময় কেবল বিশেষ কিছু প্রয়োজনে ব্যবহৃত হলেও এখন তা আধুনিক যুদ্ধকৌশলের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। এ নতুন ধারা কেবল ড্রোন নির্মাতাদের জন্যই নয়, বরং এআই, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও সুরতি যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন কোম্পানির জন্যও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
বাজার গবেষণা কোম্পানি ‘মর্নিংস্টার’-এর বিশ্লেষক লোরেদানা মুহাররেমি বলেছেন, “ভবিষ্যতের প্রতিরাব্যবস্থা বহুমাত্রিক যুদ্ধেেত্রর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন, একটি ট্যাংক এখন কেবল গোলাবারুদই ছুড়বে না, একই সাথে ড্রোন উৎপেণ করবে, স্যাটেলাইট ও চালকহীন আকাশযান থেকে সরাসরি ল্যবস্তুর লাইভ ডেটা গ্রহণ করবে, পুরো যুদ্ধেেত্র তথ্য আদান-প্রদান করবে এবং সমন্বিত নেটওয়ার্ক ফোর্সের অংশ হিসেবে কাজ করবে।’ ইউক্রেন যুদ্ধেেত্রর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৈরি কম খরচের ‘শাহেদ’ ড্রোনের ব্যবহার প্রমাণ করেছে, তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এআই ড্রোন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এগুলো নিখুঁতভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে, প্রচলিত অস্ত্রের আক্রমণ সমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে এবং দিন দিন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধেেত্রর বাস্তব অভিজ্ঞতা এখন আমূল বদলে দিচ্ছে পুরো ইউরোপের সামরিক কেনাকাটা ও প্রতিরা কৌশল। আধুনিক যুদ্ধেেত্র ড্রোন কিভাবে যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করছে তা মাথায় রেখেই সামরিক সমতা বাড়াতে শত কোটি ডলারের নতুন সব মহাপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জোটের সামরিক বাহিনীকে ‘ড্রোন-রেডি’ বা ড্রোনের মুখে পড়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ন্যাটোর বিভিন্ন সদস্য দেশ আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন-বিধ্বংসী সমতা বাড়াতে চার হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে মার্ক রুত্ত বলেছেন, ‘আধুনিক সমর কৌশলের চরিত্রকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়া ও যুদ্ধেেত্র প্রধান উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ড্রোন।’ একই পথে হাঁটছে যুক্তরাজ্যও। গত জুনের শেষদিকে প্রকাশিত প্রতিরা বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো শক্তিশালী করতে ও ড্রোনের রূপান্তরের ল্েয প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
এ দিকে, ইউক্রেনের জন্য সহায়তার হাত আরো বাড়িয়েছে জার্মানি। প্রতিরাবিষয়ক সফটওয়্যার নির্মাতা কোম্পানি ‘অটেরিয়ন’ ও ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতা ‘স্কাইফল’ যৌথভাবে ৫০ হাজার ড্রোনের বড় ক্রয়াদেশ পেয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৯ কোটি ইউরো।
ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশ হিসেবে জার্মানি এ বিপুল পরিমাণ ড্রোনের অর্ডার দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র। এসব ড্রোনে অটেরিয়নের বিশেষ স্বয়ংক্রিয় অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহৃত হবে। অটেরিয়নের প্রধান নির্বাহী লরেঞ্জ মেয়ার বলেছেন, ‘মানব ইতিহাসে ড্রোন প্রযুক্তি যথেষ্ট সহজলভ্য হওয়ার পর এটাই প্রথম যুদ্ধ, যেখানে সামরিক েেত্র এই প্রযুক্তির এত বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে।’
মেয়ার বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধেেত্রর সমীকরণ এখন দিন দিন সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অটেরিয়নের অপারেটিং সিস্টেমের কারণে শত্রুপরে ‘ইলেকট্রনিক জ্যামিং’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের চেষ্টার মুখেও এসব ড্রোন নিখুঁতভাবে ল্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে। ‘শত্রুপরে জ্যামার সক্রিয় থাকলে যেখানে আগে ভিডিও সিগন্যাল হারিয়ে যেত এবং ড্রোনের ল্যভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত, আমাদের প্রযুক্তির কারণে এখন জ্যামার থাকার পরও ড্রোন সরাসরি ল্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে।’
পাহাড় বা উপত্যকার নিচে যেখানে রেডিও তরঙ্গ পৌঁছায় না, সেখানেও এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোম্পানিটি এমন আধুনিক সফটওয়্যার নিয়েও কাজ করছে, যা দিয়ে একজন অপারেটর আলাদা আলাদা ড্রোন চালনার পরিবর্তে একসাথে একঝাঁক ড্রোনের পুরো দলকে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। জার্মানির দেয়া বড় অর্ডারটি সরাসরি ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য তৈরি করা হলেও মেয়ার বলেছেন, এ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রতি জার্মানি, নরওয়ে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীও গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে। বর্তমানে যুদ্ধেেত্র শত্রুপরে আকাশ প্রতিরা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও পর্যুদস্ত করতে কম খরচের সাধারণ ড্রোনের সাথে উচ্চ প্রযুক্তির দামি অস্ত্রের সমন্বয় ঘটিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনকে আরো বেশি মারাত্মক ও কার্যকর করে তুলছে।
আধুনিক যুদ্ধেেত্র ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ক্রমাগত ব্যবহার কেবল ড্রোন নির্মাতাদের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না, বরং এর পেছনে থাকা নিয়ন্ত্রণকারী মূল প্রযুক্তির চাহিদাও বহুগুণ বাড়িয়েছে। ‘মর্নিংস্টার’-এর বিশ্লেষক লোরেদানা মুহাররেমি বলেছেন, যুদ্ধেেত্র রিয়াল-টাইম বা তাৎণিকভাবে শত শত ড্রোনের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সুরতি যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাটল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বা যুদ্ধ পরিচালনাকারী সফটওয়্যার, এআই, স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, সেন্সর ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম।
‘এর ফলে, যেসব কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, আকাশ প্রতিরাব্যবস্থা, সেন্সর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল, সফটওয়্যার ও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো েেত্র বড় আকারের কাজের অভিজ্ঞতা ও সমতা রয়েছে, ভবিষ্যতের প্রতিরা বাজেটের সিংহভাগ তাদের পকেটেই যাবে।’



