রংপুর ব্যুরো
উপজেলা স্কুলের অবসরে যাওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তার স্ত্রী-কন্যা ও পুত্র হত্যার ঘটনায় এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, দুইজন কিভাবে হত্যা করল; চারজনকেসহ ১৮টি প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় মহানগর নাগরিক কমিটি।
শনিবার দুপুরে রংপুর সুমি কমিউনিটি সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে মহানগর নাগরিক কমিটি। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোজাহার আলীসহ নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে পলাশ কান্তি নাগ বলেন, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা আগামী চক্রবর্তী এবং শিশুপুত্র আয়ুশ চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ নিহতদের প্রতিবেশী বিনোদ দাসের পুত্র সিদ্ধার্থ দাস এবং কানু দাসের পুত্র মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করে। এ গ্রেফতারসংক্রান্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ যে বয়ান হাজির করে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দানা বাধতে শুরু করে। পরবর্তীতে সামগ্রিক ঘটনা প্রবাহে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাছে ওই ঘটনার তদন্ত এবং অপরাপর বিভিন্ন বিষয়ে ১৯টি প্রশ্নের উত্তর দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মাদকসেবী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার লোকলজ্জার ভয়ে কি একের পর এক চারজন মানুষকে খুন করে ফেলা সম্ভব? মাদক সেবনই যদি মূল উদ্দেশ্য হতো, তবে গণপতি চক্রবর্তীর পাশের নির্মাণাধীন (জনশূন্য) বাড়িটিই তো নিরাপদ ছিল। ঝুঁঁকি নিয়ে বসতবাড়ির ছাদে কেন তারা আসবে?
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, কোনো ধারালো অস্ত্র ছাড়া শুধু গামছা ও রশি দিয়ে এত দ্রুত চারজনকে খুন করা কিভাবে সম্ভব হলো? অস্ত্র ব্যবহার না হলে বাড়ির মেঝেসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ কেন?
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, খুনের সময় গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সবাই কি একে একে খুনি ২ কিশোরের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল? তখন তারা কি কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি বা বাঁচার জন্য চিৎকার করেননি? তাহলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতিবেশীরা কিছু শুনতে পেলেন না কেন? বাড়িতে চারটি লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পরও প্রতিবেশীরা কিভাবে বুঝতে পারলেন না?
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়
পুলিশের তাৎক্ষণিক ভাষ্য অনুযায়ী রাতের কোনো এক সময়ে খুন সঙ্ঘটিত হয় এবং এরপর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু আগামী চক্রবর্তীর বান্ধবীর সাথে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের ফেসবুক চ্যাটিং অনুযায়ী জানা যায়, সারা রাত ওই বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল না, অর্থাৎ ভোর পৌনে ৬টা পর্যন্ত তারা জীবিত ছিলেন বলে ইঙ্গিত মেলে। তাহলে প্রকৃত সময়কাল নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?
আরো বলা হয়, বাড়ির সামনের মন্দিরে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ কোথায় গেল?
অভিযুক্তরা জুমার নামাজের সময় রাস্তা ফাঁকা পেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িসংলগ্ন পুরো এলাকা হিন্দুধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত, যেখানে কোনো মসজিদ নেই এবং মুসল্লিদের চলাচলও নেই; তাহলে এ বয়ান কিভাবে সঙ্গতিপূর্ণ?
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ঘটনার কিছুদিন আগে আগামী চক্রবর্তী তার বান্ধবীর কাছে ফেসবুক মেসেঞ্জারে জানতে চেয়েছিলেন, থানায় জিডি বা এফআইআর করলে সরকারি চাকরিতে প্রভাব পড়বে কি না। তিনি কেন থানা-পুলিশের আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন? মামলার বাদি গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির নির্মাণকাজ নিয়ে চাঁদাবাজদের হুমকির মুখে ছিলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তাহলে কারা তাকে চাঁদার জন্য হুমকি দিচ্ছিল, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে কি?
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়া গণপতি চক্রবর্তী খুনের কয়েক দিন আগে ব্যাংক থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা তোলেন। সে টাকা এখন কোথায়?
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও কন্যা আগামী চক্রবর্তীর লাশ বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার হয় এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় মুখমণ্ডল কালো ও বিকৃত ছিল। পোস্টমর্টেমে যুক্ত ডোম যতীন বাসফোরের ভাষ্যমতে উভয়ের শরীরে স্পার্মের উপস্থিতি ছিল, কিন্তু রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক তথা ফরেনসিক কর্মকর্তা বাবুল কুমার বিশ্বাস বলছেন, ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি এবং মৃত্যুর দুই দিন পর এমন আলামত সংগ্রহের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। এ পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সুরাহা কী? সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সিআইডি ল্যাবে ডিএনএ বা ফিঙার প্রিন্ট রিপোর্ট আসতে ন্যূনতম ১৫-২০ দিন সময় লাগে বলে জানা যায়। তাহলে এত দ্রুত কিভাবে খুনি চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা হলো?
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ঘটনার আগে-পরে অচেনা মোটরসাইকেলগুলোর ভূমিকা কী? ঘটনার রাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতির বাড়ির সামনে অচেনা মোটরসাইকেলের আনাগোনা ছিল বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
সেগুলো কার ছিল? তারা কেন সেখানে এসেছিল? কেউ কি আগে থেকে বাড়িটি পর্যবেক্ষণ বা রেকি করছিল?
সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রশ্নের উত্তর দাবি করেন পলাশ কান্তি নাগ। এর মাধ্যমে ধোঁয়াশা দূর হবে বলেও মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে রংপুর মহানগর পুলিশের অপু পুলিশ কমিশনার বিবি সনাতন চক্রবর্তী জানান, আমাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ আদালতে দেয়া জবানবন্দী এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখন পর্যন্ত যা আমরা পেয়েছি সেটি ব্রিফ করেছি আমরা। তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই এখনো বলা যাচ্ছে না। তদন্ত আমরা ফুলস্টপ করিনি। সুতরাং সব প্রশ্নের উত্তর সমাধানের মাধ্যমে ঘটনাটি পরিষ্কার হবে। কিন্তু তার আগেই এভাবে জাজমেন্ট দেয়া হচ্ছে। তাতে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।



