বিনা টেন্ডারে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল কিনবে সরকার

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (বিনা টেন্ডারে) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া এক লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল কেনারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এই তেল আমদানির প্রস্তাব নিয়ে আসা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ‘আবীর ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটসে’র কাছ থেকে এই অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা হবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘœ মোকাবেলা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা স্বাভাবিক রাখতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়।

সূত্রটি জানিয়েছে, চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে জ্বালানি মজুদ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহের লক্ষ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বা বিনা টেন্ডারে ক্রুড অয়েল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জরুরি ভিত্তিতে এই এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল কেনার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে গতকাল নীতিগত অনুমোদন নেয়ার সাথে সাথেই প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয় এবং কমিটি তা অনুমোদন করে।

এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানির অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো জাপিন (বিএসপি জাপিন) থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস অয়েল ০.৫ শতাংশ ‘এস’ (ডিজেল) কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবটিও প্রথম অর্থনেতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন নেয়া হয় এবং তার পরপরই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তবটি অনুমোদন করে।

এ ছাড়া বৈঠকে বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আর এক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এক্সন মোবিল কাজাখস্তান ইনকরপোরেটেড (ইএমকেআই)- থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ইএন৫৯০-১০ পিপিএম সালফার মানমাত্রার ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই প্রস্তবটিও প্রথম অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয় এবং এর পরপরই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়।

কয়েকটি প্রস্তাব প্রত্যাহার : এ দিকে বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ হংকংয়ের ফালকো করপোরেশন লিমিটেড থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল কেনার আর একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠক থেকে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আর্চার এনার্জি এলএলসি থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল কেনার আর একটি প্রস্তাবও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির মাধ্যমে এক লাখ মেট্রিক টন ৫০ পিপিএম সালফার মানমাত্রার ডিজেল কেনার আরেকটি প্রস্তাব আনা হলেও, সেটিও আলোচনা থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয় বলে জানা গেছে।

ভারতীয় ঋণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোসহ রাশিয়া থেকে সার অমদানি অনুমোদন

এ দিকে বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় ঋণে নির্মাণাধীন বাংলাদেশ রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্মাণের পূর্তকাজের ভেরিয়েশনসহ রাশিয়ার সাথে সরকারি পর্যায়ে চুক্তির আওতায় ৩৫ হাজার মে.টন এমওপি সার আমদানির ২টি প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়া হয় গতকালের বৈঠকে।

সভা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন (২য় সংশোধিত) প্রকল্পের (প্যাকেজ-ডউ-১) নির্মাণের পূর্ত কাজের ভেরিয়েশন প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে কমিটি।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনক্রমে প্রকল্পের (প্যাকেজ-ডউ-১) নির্মাণের পূর্তকাজ কধষরহফবব জধরষ ঘরৎসধহ (অ ফরারংরড়হ ড়ভ ঞবীসধপড় জধরষ ্ ঊহমরহববৎরহ খঃফ.)-এর কাছ থেকে সিডি ভ্যাট ছাড়া ৫৪৪ কোটি ৮৬ লাখ ৭৭ হাজার ৬৩৯ টাকায় ক্রয়ের চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুসারে পূর্তকাজ চলমান অবস্থায় বাস্তবতার নিরিখে টেন্ডারভুক্ত কিছু আইটেম হ্রাস/বৃদ্ধি, টেন্ডার বহির্ভূত কিছু আইটেম এবং সিডি ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে সিডি ভ্যাট বাবদ ১২৫ কোটি ৯০ লাখ ১৯ হাজার টাকা এবং মূল চুক্তির অতিরিক্ত এক কোটি ৭৫ লাখ ৩৫১ টাকাসহ সর্বমোট ৬৭২ কোটি ৫১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৯১ টাকার সংশোধিত চুক্তিমূল্যের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে কমিটি তাতে অনুমোদন দিয়েছে।

২য় সংশোধিত প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০২৫ সালের ২৫ মে তারিখ অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

ভেরিয়েশনের কারণ হিসেবে জানা গেছে, কুলাউড়া জংশন ইয়ার্ডে সম্প্রসারণ এবং মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজসহ অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ, বিওকিউর অন্তর্ভুক্ত ৮১টি আইটেমের পরিমাণ হ্রাস, এমব্যাংকমেন্ট প্রশস্ত করায় কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্রিজ এবং কালভার্ট অংশে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি, পিচ ঢালাইয়ের পরিবর্তে রিজিভ পেভমেন্ট নির্মাণ, ১৭টি নতুন আইটেম সংয্ক্তু হয়েছে এবং সিডি ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত।

ঋণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মূল চুক্তিমূল্য প্রকল্প ঋণ থেকে এবং সিডি ভ্যাট জিওবি হতে পরিশোধ করা হবে। ভেরিয়েশন প্রস্তাব মূল চুক্তিমূল্যের ১৪.২২ শতাংশ বেশি বলে জানা গেছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির আওতায় ঋড়ৎবরমহ ঊপড়হড়সরপ ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃরড়হ (চৎড়ফরহঃড়ৎম) রাশিয়া থেকে ৯ম লটে ৩৫ হাজার মে.টন মিউরেট-অব-পটাশ (এমওপি) সার আমদানির একটি প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। সভা সূত্রে জানা গেছে, বিএডিসি কতৃক রাশিয়া থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে এমওপি সার আমদানির প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়।

ইতঃপূর্বে সম্পাদিত চুক্তির কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় বিগত ২৪/০৭/২০২৫ সালের ২৪ জুন চুক্তি নবায়ন করা হয়। সার আমদানি চুক্তিতে উল্লিখিত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসারে সারের মূল্য নির্ধারণ করে ঋড়ৎবরমহ ঊপড়হড়সরপ ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃরড়হ রাশিয়া থেকে ৯ম লটে ৩৫ হাজার (+১০%) মে. টন এমওপি সার বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে সর্বমোট ব্যয় হবে এক কোটি ২৬ লাখ ১৮ হাজার ৫৫০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৫৪ কোটি ৮৯ লাখ ২৭ হাজার ১২ টাকা। প্রতি মে. টন এমওপি সার ৩৬০.৫৩ ডলার।

২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিএডিসি কর্তৃক এমওপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ৮.৫৯ লাখ টন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫৫ লাখ টন। এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩.৭০ লাখ মে.টন।