ধারাবাহিক পতনে ধুঁকছে পুঁজিবাজার

বিএসইসি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ধারাবাহিক পতনের ফলে নতুন করে ধুঁকছে দেশের পুঁজিবাজার। গত এক সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটেছে ১৩০ পয়েন্টে বেশি শতাংশের হিসাবে, যা ২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এক দিন সরকারি ছুটির থাকায় সপ্তাহটির মাত্র চার কার্যদিবসে এ পতন ঘটে ডিএসইর প্রধান সূচকটির। একই চিত্র ছিল দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেরও (সিএসই)। টানা দরপতনের কারণে বাজারগুলোর লেনদেনের চিত্র ছিল আরো ভয়াবহ। মাত্র ৩২টি কর্মদিবসের ব্যবধানে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন এক হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা থেকে নেমে আসে ৪৬৭ কোটি টাকায়। অন্য দিকে মাত্র দুই দিন আগে ২৫ আগস্ট চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারের লেনদেন নেমে এসেছিল চার কোটি টাকায়।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল খুব দ্রুতই তা শেষ হতে চলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী কার্যদিবসে পুঁজিবাজারে যে ইতিবাচক মোড় নেয়, তার প্রমাণ ছিল পরবর্তী কর্মদিবসে ডিএসই সূচকের বড় ধরনের উল্লম্ফন। ১৫ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটে ২০০ পয়েন্টের বেশি। কিন্তু ক’দিন না যেতেই শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাজারের স্বাভাবিক গতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় জ্বালানি তেলের সঙ্কট তৈরি হলে নেতিবাচক প্রবণতা ভর করে বাজারে। পরে যুদ্ধের ভয়াবহতা কমে গেলেও জ¦ালানি সঙ্কট থেকে আর বের হতে পারেনি দেশ। সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হলেও মূল সঙ্কটের সমাধান রয়ে গেছে অধরা যার ফল ভোগ করছে উৎপাদনশীল সব খাত। আরি একই সঙ্কটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে দেশের পুঁজিবাজারে। বিগত ২০টি কর্মদিবসের মধ্যে ১৭টিতে দেশের দুই পুঁজিবাজারের সব সূচকের পতন ঘটে।

পুঁজিবাজারের নেতিবাচক প্রবণতা শুরু হয় চলতি মাসের শুরু থেকেই। গত দুই সপ্তাহ ধরে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। ঢাকা স্টকের প্রধান সূচক ডিএসইক্স গত সপ্তাহে ১৩০ দশমিক ৪১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। রোববার ৫ হাজার ৭৮৬ দশমিক ০৮ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে নেমে আসে ৫ হাজার ৬৫৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৬৪ ও ২৩ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষদিন বাজারটি সূচকের নামমাত্র উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ওই দিনও বেশির ভাগ খাত শিকার হয় দরপতনের।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ সময় ধরেই বাজারের মন্দা দেখে আসছেন। আর এই মন্দায় তারা তাদের পুঁজির একটি বড় অংশই লোকসান দিয়ে আসছেন। ফলে বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দ্রুতই তাদের মাঝে হতাশা তৈরি করে, যা একপর্যায়ে আতঙ্কে রূপ নেয়। আর এ অবস্থায় লোকসান দিয়ে হলেও দ্রুত বাজার থেকে বেরিয়ে আসতে চান। এভাবেই ধীরে ধীরে হ্রাস পায় বাজারের লেনদেন। মাত্র ৩২টি কর্মদিবসের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন এক হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা থেকে নেমে আসে ৪৬৭ কোটিতে। গত ১২ জুলাই ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। একই বাজারটি গত ২৭ আগস্ট লেনদেন নিষ্পত্তি করে মাত্র ৪৬৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগকারীদের হতাশার কারণেই ধুঁকছে পুঁজিবাজার।

খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের শেয়ারের আধিপত্য ছিল। লেনদেন চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ দখলে নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে বস্ত্র খাত। ১২ দশমিক ৭ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওষুধ ও রসায়ন খাতের দখলে ছিল লেনদেনের ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রকৌশল খাত ৯ দশমিক ৩ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে ছিল। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের দখলে ছিল মোট লেনদেনের ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

ডিএসইতে গত সপ্তাহে সব খাতই ব্যাপক লোকসানে ছিল। লেনদেনে যেমন এগিয়ে ছিল তেমনি সবচেয়ে বেশি ৫ দশমিক ২ শতাংশ দরপতনের শিকার বস্ত্র খাত। এ ছাড়া সাধারণ বীমা খাতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৪ দশমিক ১, তথ্যপ্রযুক্তি খাথতে ৪, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ৩ দশমিক ৯ ও সেবা খাতে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ দরপতন ঘটে এ সময়।

এ দিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালকদের দায়িত্বে রদবদল ও নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রশাসন ও অর্থ বিভাগ থেকে শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্ব বণ্টনসংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। এর আগে গত ১৮ আগস্ট তিনজন পরিচালককে নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি দেয় বিএসইসি। পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, রাজীব আহমেদ ও মো: মনসুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আজমকে আর্থিক সাক্ষরতা বিভাগ এবং পরিচালন ব্যবস্থা কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার নতুন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আগে তিনি প্রশাসন ও অর্থ এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। আনোয়ারুল ইসলামকে বাজার ও মধ্যস্থতাকারী বিষয়ক এবং বাজার গোয়েন্দা ও তদন্ত বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আগে তিনি ইস্যুয়ার কোম্পানি-বিষয়ক ও ডেরিভেটিভস বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরীকে ইস্যুয়ার কোম্পানি-বিষয়ক বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আগে তিনি বাজার গোয়েন্দা ও তদন্ত এবং আর্থিক সাক্ষরতা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। আবুল কালামকে ডেরিভেটিভস বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি আগের মতোই কমিশনের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন নির্বাহী পরিচালকদের মধ্যে মোহাম্মদ মাহমুদুল হককে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। রাজীব আহমেদকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের এবং মনসুর রহমানকে প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্য নির্বাহী পরিচালকদের দায়িত্ব অপরিবর্তিত রয়েছে।