তৈরী পোশাক খাত নিয়ে সিপিডি

সঠিক যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনে বছরে ২.৫৬ হাজার মেগাওয়াট শক্তি সাশ্রয় হবে

Printed Edition
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা : নয়া দিগন্ত
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের তৈরী পোশাক খাতে টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, মোট ব্যয়ের প্রায় ৭১ শতাংশ খরচ হবে দেশের শীর্ষ ২৫ শতাংশ বড় কারখানাগুলোতে। সঠিক মডেল অনুযায়ী যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে বছরে প্রায় দুই লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। আর ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, এই মুহূর্তে সরকারের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম করা দরকার, যারা জরুরি ভিত্তিতে সমাধানগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাবে। জ্বালানি খাতের যে ভয়াবহ সঙ্কট তা দশকেও যাবে না।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামি মোহাম্মদ। গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বিজিএমইএর সহসভাপতি ব্যারিস্টার বিদ্যা অমৃত খান, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার, বিকেএমইএর শীর্ষ নেতা ফজলে শামীম এহসান, শিল্প বিশেষজ্ঞ ও সিইও নভোএয়ার আরশাদ জামিল দিপু, এইচএসবিসির সাসটেইনেবেলিটির প্রধান সৈয়দা আফজালুন নেসা, আসিফ শাহরিয়ার, রেসকোর নুরে আলম, ব্যবসায়ী মো: শামীম মনির উদ্দিন, গ্রামীণ শক্তির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সাত্তার, বিকেএমইএর ফারজানা শারমিন প্রমুখ।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি সঙ্কটে বিকল্প বলতে সবাই এখন আমরা এলএনজির কথা বলছি। যেটা আসলে বড় কোনো সমাধান নয়, সাময়িক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অবশ্যই এই ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে সম্ভব নয়। সময় এসেছে বিকল্প জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে আমাদের শিল্পকারখানার বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো গড়ে তোলা। যেমন শিল্পকারখানাগুলোতে বিদ্যুতের যে চাহিদা রয়েছে, তার একটি অংশ যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে রিপ্লেস করা যায়। একইভাবে গাড়িতে যদি আমরা ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে এনে ইলেকট্রিক ভেহিকেলে যেতে পারি। শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে যে ডিজেল লাগছে সেটির বিকল্প হিসেবে আরো বেশি সোলার বেসড ইরিগেশন সিস্টেমে যেতে পারলে অথবা ইলেকট্রিক ইরিগেশনে যেতে পারলে। সমস্যাটা হচ্ছে সমাধানগুলো গত বেশ কিছুকাল ধরেই বলা হচ্ছে। বিভিন্ন রকমের উদ্যোগের কথাও শুনেছি কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকার সবকিছু প্রকিউরমেন্টে করুক, কিন্তু জিনিসটা হচ্ছে সেটি দ্রুত করা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। তবে স্বাভাবিক সময়ের মতো এগুলো যাতে এগোয় না। এই মুহূর্তে একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম দরকার। সবকিছু মিলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে আমরা দেশের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে চাইলে মূল কাজটি শুরু করতে হবে গার্মেন্টস খাতকে দিয়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতায় সমস্যা হচ্ছে। এখানে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই। কোনো কোনো পক্ষ এসব দীর্ঘায়িত করাচ্ছে। বর্তমানে দেশে জ্বালানির ভয়াবহ সঙ্কট।

তৈরী পোশাক খাতের ৩৫০টি কারখানার ওপর পরিচালিত সিপিডির এক গবেষণা বলছে, সেগুলোতে যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়ালেও শক্তির ব্যবহার কমেনি, উল্টো বেড়েছে। গার্মেন্টস খাতে জ্বালানি ব্যয় কমাতে কারখানায় টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। সেটা নিশ্চিত করতে গার্মেন্টস খাতের ১৫ হাজার দু’টি যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করা জরুরি। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। আর ৫০ শতাংশ আধুনিকায়নে ব্যয় হবে ছয় হাজার ৬০৪ কোটি টাকা।

গবেষণায় দেখা গেছে, বড় কারখানার মধ্যে যাদের গড়ে দুই হাজার ১০৫ জনের বেশি কর্মী রয়েছে। মোট ব্যয়ের ৭০.৯ শতাংশই তাদের জন্য প্রযোজ্য। প্রতি কারখানায় গড়ে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নেই খরচ হবে ৭৩.১ কোটি টাকা। অন্য দিকে সবচেয়ে ছোট কারখানায় গড়ে ১১১ জন শ্রমিক মাত্র ০.৩ শতাংশ খরচের মাধ্যমে শক্তি সাশ্রয় করা সম্ভব। অন্য দিকে কাটিং বিভাগে মাত্র ৫.৫ শতাংশ মেশিন থাকলেও প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ২৭.৩ শতাংশ সাশ্রয় সম্ভব। সেলাই বিভাগে ৮৫ শতাংশ মেশিন থাকলে এগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অপরিহার্য হওয়ায় সাশ্রয়ের হার ২.৯ শতাংশ। তবে ডাইং ও ওয়াশিং বিভাগে গ্যাসের ব্যবহার বেশি হওয়ায় সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে শতভাগ কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব নয়। আর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে কারখানার বিদ্যুৎ খরচ ৪.৪ থেকে ২৩.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। ছোট ও মাঝারি কারখানার প্রযুক্তি পরিবর্তনের সুবিধার্থে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও কারখানাগুলোতে কার্যক্ষমতা-ভিত্তিক এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করার ওপর তাগিদ দেয়া হয়।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত দেশের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী। এই খাতে কার্বন নির্গমন কমানোর খরচ কমাতে ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।

মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, আগামীর বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। এই ক্ষেত্রে যে বাধা রয়েছে তা অপসারণ করতে হবে। তা না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হবে না। উল্টো আমাদের শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরে কর বেড়েছে। কারো কারো দুই কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে।

ফজলে শামীম এহসান বলেন, ইউরোপীয় আইন ও বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে গ্রিন এনার্জি গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং বাধ্যতামূলক বিষয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে থাকলেও নীতিমালা ও ঋণের জটিলতার কারণে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হচ্ছেন না। বিশেষ করে সোলার প্যানেল স্থাপনে ভবন বিধিমালার বাধা। ব্যাংকঋণের দীর্ঘসূত্রতা গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি গড়ার পথকে কঠিন করে তুলছে। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎসাশ্রয়ী মোটর ব্যবহার এবং নতুন শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিকল্পিত জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর এখানে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সবশেষে, টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারি নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ এবং ট্যাক্স-সুবিধার প্রকৃত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।

মো: শামীম মনির উদ্দিন বলেন, এই মুহূর্তে যেকোনোভাবেই হোক উৎপাদনে রাখাটা তৈরী পোশাক খাতের লক্ষ্য। রাজস্ব বোর্ডকে আরো ক্রিয়েটিভ হতে হবে। রুফটপ ব্যবহার করে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জ্বালানি পাওয়া যেতে পারে।