ইসরাইলের সাথে ইইউর শত শত কোটি ইউরোর গোপন বাণিজ্য

Printed Edition

আলজাজিরা

গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের ক্রমাগত যুদ্ধাপরাধ ও রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলো ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সাথে একের পর এক লাভজনক বাণিজ্য চুক্তি সই করে চলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘স্টেটওয়াচ’-এর সংগৃহীত এবং আল জাজিরার হাতে আসা বিশেষ নথিতে ইউরোপের এই দ্বিমুখী নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের মাটিতে ফিলিস্তিনের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার এবং ইসরাইলের তীব্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত স্পেন নিজেই ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের মধ্যে ইসরাইলের সাথে ২২৭ মিলিয়ন ইউরোর ১৪টি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর সিংহভাগ অর্থ অর্থাৎ ২০৭ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় হয়েছে ২০২৪ সালের এপ্রিলে স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইসরাইলের ‘রাফায়েল’ কোম্পানির মধ্যে হওয়া একটি আকাশ যুদ্ধ ব্যবস্থা ক্রয়ের পেছনে। এমনকি স্পেনের পুলিশ বাহিনীও ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান থেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট কিনেছে। সামগ্রিকভাবে ইইউর সদস্য দেশগুলো ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সাথে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের ১৯৪টি চুক্তি সই করেছে। তবে প্রকৃত বাণিজ্যের পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ ইইউর প্রকাশ্য নথিতে অনেক বড় বড় চুক্তির আর্থিক মূল্য এক ইউরোরও কম দেখিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর বাণিজ্য দ্বিগুণ

গাজায় ইসরাইলি নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর এই বাণিজ্যিক লেনদেনের গতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুদ্ধের আগের ২১ মাসে ইসরাইলের সাথে যেখানে ১.২ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তি হয়েছিল, সেখানে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত পরবর্তী ২১ মাসে চুক্তি সই হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি- যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ইউরো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই স্বাভাবিক বাণিজ্যিক মনোভাব আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান মামলার সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২৪ সালে আইসিজে এক রায়ে সমস্ত রাষ্ট্রকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের বেআইনি উপস্থিতিকে কোনো প্রকার সহায়তা না করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল। অস্ট্রিয়ার সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির আইনি গবেষক অধ্যাপক ইউসেফ আল তামিমি বলেন, ইসরাইলের প্রতি ইইউর এই শিথিল দৃষ্টিভঙ্গি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

গণহত্যায় পরোক্ষ রসদ

ইসরাইলের বিতর্কিত সামরিক কোম্পানি এলবিট সিস্টেমস, রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস এবং ট্রোয়া টেক ডিফেন্স লিমিটেড ইইউর শীর্ষ ১০টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। ইউরোপে ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হাঙ্গেরি একাই ৬০৩ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের ৪২টি চুক্তি করেছে। তবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সুইডেন কিংবা সংহতি প্রকাশ করা স্পেনের মতো দেশগুলোও তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসরাইল থেকে পণ্য কেনা বন্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ইসরাইলের অন্ধ সমর্থক জার্মানি সামরিক সরঞ্জাম, সাইবার নিরাপত্তা সফটওয়্যার ও চিকিৎসা সরঞ্জামসহ নানা খাতে ৩৭টি চুক্তি করেছে। জার্মান অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অবশ্য দাবি করেছেন, ইইউর প্রচলিত দরপত্র আইন অনুযায়ী যেকোনো দেশের কোম্পানিই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। এ ছাড়া স্পেনের পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব মাদ্রিদ, বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি হসপিটাল লিউভেন এবং ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইসরাইলি প্রযুক্তি ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট কনার জন্য বড় অঙ্কের চুক্তি সই করেছে।