যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র এক মাস পার হতে না হতেই পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে নৌঅবরোধ আরোপের প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একযোগে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ডবাহিনী (আইআরজিসি)। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।

ইরানের সব বন্দরে আবারো নৌঅবরোধ আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তেহরান আলোচনায় না ফিরলে আগামী সপ্তাহে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো অবকাঠামোতে হামলা চালাবে মার্কিন বাহিনী। রয়টার্স লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্ঘাত নতুন করে তীব্রতা পাওয়ার পর এটি ওয়াশিংটনের সর্বশেষ বড় পদক্ষেপ।

ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় আরো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলছে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করার যে সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে, তা দুর্বল করাই হামলার লক্ষ্য। অন্য দিকে তেহরান জানিয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফের সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর তারা আবারো হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।

ইরানে সাত ঘণ্টার মার্কিন তাণ্ডব : সেনাসহ নিহত ৩৭

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার ইরানের উপকূলীয় এলাকা এবং হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টানা সাত ঘণ্টা ধরে চালানো হয়েছে বিধ্বংসী বিমান হামলা। মার্কিন যুদ্ধবিমান, চালকবিহীন ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে নিখুঁতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌসক্ষমতা এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

ইরানি গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ইতিহাসে এই প্রথম ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি কোনো হামলা চালাল মার্কিন বাহিনী। সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের বামপুর শহরের একটি সেনা ব্যারাকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩৮৮তম ব্রিগেডের অন্তত ৭ জন সেনার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরো ১৩ জন। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন হামলার শিকার হয়ে অন্তত ৩০ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সবমিলিয়ে এই হামলায় আহত হয়েছেন ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ। পাশাপাশি চাবাহার বন্দরের একটি বেসামরিক সামুদ্রিক ওয়াচটাওয়ার এবং খুজেস্তান প্রদেশের একটি গম সংরক্ষণের বড় সাইলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ভয়াবহ পাল্টা আঘাত

মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্দানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে ইরান। কুয়েত সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে, তাদের একটি নৌবাহিনীর জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে চারজন ক্রু গুরুতর আহত হন। বাহরাইনে এই প্রথম সচল করা হয়েছে বিমান হামলার সাইরেন এবং নাগরিকদের শান্ত থেকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে জর্ডানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী অন্তত চারটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ভূপাতিত করেছে দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

সমঝোতা চুক্তি বাতিল : বিশ্বকে তেল ও গ্যাস বন্ধের হুমকি

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সই হওয়া ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তিটিকে (ইসলামাবাদ চুক্তি) সম্পূর্ণরূপে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে তেহরান। জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে পাঠানো এক কড়া চিঠিতে বলেছেন, আমেরিকা এ সঙ্কটে কোনো ভুক্তভোগী নয়, বরং তারাই মূল হামলাকারী ও চুক্তি লঙ্ঘনকারী। তেমনি ইরানের বিপ্লবী গার্ডবাহিনী সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই ছাড়বে না। আইআরজিসি এক কড়া বার্তায় বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রফতানি হলে সবার জন্য হবে, অন্যথায় কারও জন্যই নয়। ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সতর্কতামূলক গুলি ছুড়ে অন্তত দু’টি বড় জাহাজকে আটকে দিয়েছে ইরানি নৌবাহিনী।

তা ছাড়া হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল অচল করে দেয়ার পর এবার লোহিতসাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধের বিপজ্জনক কার্ডটিও কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান। ইয়েমেনের হাউছি মিত্রদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ আরো বাড়াতে চাইছে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি জ্বালানি পরিবহন পথই ঝুঁকিতে পড়বে। ইরানের প্রেস টিভির ওয়েবসাইটের খবরে বলা হয়েছে- ইয়েমেনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সোমবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তাদের দেশের সশস্ত্রবাহিনী বাব আল মান্দেব বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত, যদি সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে। প্রণালীটি বন্ধ হলে তেলের দাম দিনে ২০০ ডলারে দাঁড়াতে পারে।

ইয়েমেনের হাউছি সংগঠন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেন, ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে ইয়েমেনে হামলা করার জন্য উসকে দিচ্ছে। এ ধরনের উসকানি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে না। সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাড়াবাড়ির দিকে গেলে হরমুজের সাথে সাথে বাব আল মান্দেব প্রণালীও বন্ধ হবে। তখন তেলের দাম আকাশচুম্বি হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব বাণিজ্যে ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব খাটাতে হরমুজ প্রণালী যদি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়, তবে বাব আল-মান্দেব প্রণালী হতে পারে তাদের শেষ বা বিকল্প বড় অস্ত্র।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গেরগেসের বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরান শেষ পর্যন্ত যেতে ইচ্ছুক।’ তেহরান ওয়াশিংটনকে দেখাতে চাইছে, তারা হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব দুই নৌপথই একসাথে অচল করে দিতে পারে। এতে দ্বিপক্ষীয় সঙ্ঘাত বিশ্বে জ্বালানি বাণিজ্য সঙ্কটে রূপ নিতে পারে। ‘এখন (তেহরান) কাছের অঞ্চলে এবং বিস্তৃত এলাকাজুড়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বার্তাটি হলো কেবল হরমুজ নয়, বাব আল-মান্দাবও এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন বিপদ হলো- তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে উভয় পক্ষের ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান বা তৎপরতা বাড়াতে থাকার (মিশন ক্রিপ) ঝুঁকি বেশি, যার মানে হলো- একে অপরের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকা, কিন্তু সরাসরি সঙ্ঘাতে জড়ানোর মতো সীমারেখা অতিক্রম না করা।

ট্রাম্পের কড়া আলটিমেটাম ও অর্থনৈতিক চাপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের পরমাণু ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকবে। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশটির মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বড় বড় সংযোগকারী সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ আক্রমণ চালানো হবে। হামলার পাশাপাশি ইরানের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থ বিভাগ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে যুক্ত প্রায় ১৩ কোটি ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি (ডিজিটাল মুদ্রা) জব্দ বা ক্রোক করেছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে, যা গোটা বিশ্বের জন্য এক নতুন সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ ১৯৪৯ সালের জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী, বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য স্থাপনায় হামলা করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।