বিশেষ সংবাদদাতা
- নিম্নআয়ের মানুষের ওপর করের বাড়তি চাপ পড়বে
- কালোটাকা সাদা করার সুযোগ করবৈষম্য বাড়াবে
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, উচ্চ প্রবৃদ্ধি, অন্তর্ভুুক্তিমূলক অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের যে রূপরেখা দেয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও এর বড় সঙ্কট রয়ে গেছে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও দুর্বল ভিত্তির ওপর প্রাক্কলন (অভিমত) তৈরিতে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে করমুক্ত আয়ের যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, চলতি অর্থবছরের চতুর্থ কোয়ার্টারে (এপ্রিল-জুন) অর্থনীতিতে হঠাৎ বড় কোনো জাদুকরী পরিবর্তন হবে, এমন অবাস্তব অনুমিতির ওপর দাঁড়িয়ে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। আর বরাবরের মতো এবারো অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা আবাসন খাতে (জমি, ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট) বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ করের ন্যায্যতাকে নষ্ট করে করবৈষম্য বাড়াবে।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পরবর্তী পর্যালোচনা নিয়ে শুক্রবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
করকাঠামোর পথরেখা ইতিবাচক
উপস্থাপনায় ফাহমিদা খাতুন জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি প্রক্ষেপণ বা পথরেখা দেয়া হয়েছে। যেমন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা একরকম থাকলেও ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা হবে চার লাখ টাকা। এর পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এই সীমা বাড়িয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, করের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকা একটি ইতিবাচক দিক। এর ফলে করদাতারা আগে থেকেই জানতে পারেন যে কত আয় করলে কত টাকা কর দিতে হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনায় সাহায্য করে। তিনি বলেন, কর প্রস্তাবনায় সামগ্রিকভাবে অনেক ধরনের ভালো ভালো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য। এখানেও একধরনের পূর্বানুমান দেয়া হচ্ছে।
করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো উচিত ছিল
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সাথে এই সামান্য বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। করমুক্ত আয়ের সীমাটা আরেকটু বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের জন্য খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় সংশোধিত প্রাক্কলন করেছে ৫ শতাংশ। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে তা মাত্র ৪.১৪ শতাংশ। ফলে হঠাৎ করে প্রবৃদ্ধির এই লাফ দেয়া কতটা বাস্তবসম্মত, তা ভাববার বিষয়।
ঋণপ্রবাহের ধীরগতি ও তারল্য সঙ্কট
সিপিডি বলছে, ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা আগামী অর্থবছরের জন্য ৯.৪ শতাংশ ধরা হলেও বাস্তব চিত্র বেশ হতাশাব্যঞ্জক। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। ড. ফাহমিদা প্রশ্ন তোলেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যেখানে আস্থা ও এক ধরনের অনীহা কাজ করছে, সেখানে আগামী দুই মাসে এটি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৮ শতাংশে কীভাবে যাবে? আর তা না হলে আগামী বছরের ৯.৪ শতাংশ অর্জন করা আরো কঠিন হবে। তিনি সতর্ক করেন যে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, তবে ব্যক্তি খাতের জন্য তারল্য সঙ্কট তৈরি হবে, যা ঋণের সুদের হার আরো বাড়িয়ে দেবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে।
মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ সঙ্কট
ড. ফাহমিদা বলেন, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশ এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে তা ৯.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে আগামী বছরের জন্য সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
কালো টাকা সাদা করা প্রসঙ্গে
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিকভাবে এটা যুক্তিসঙ্গত নয়, এটা নৈতিকভাবেও কাম্য নয়। কারণ, যারা সঠিকভাবে দিচ্ছেন, তাদের জন্য এটা একটা অনুৎসাহ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিকভাবেও এটা ইতিবাচক নয়। কারণ, সাধারণ মানুষ মনে করেন যে যারা দুর্নীতি করেছে, কর ঠিকমতো দেয়নি, সরকার তাদের সুবিধা দিয়েছে আর আমাদের (সাধারণ মানুষ) ওপরে কর চাপানো হচ্ছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তি ঠিক নেই
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাক্কলন নির্ধারণ করেছে, তার মূল ভিত্তি নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন। তিনি বলেন, সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওপর ভিত্তি করে একটা প্রাক্কলন করেছে। সেটা সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ, রফতানি, আমদানি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি- সব কিছুর জন্য গত অর্থবছরের আলোকে যে ভিত্তিটা করা হয়েছে, আমাদের বিবেচনায় সে ভিত্তিটাই কিন্তু ঠিক না। মূল্যস্ফীতি যেখানে সাড়ে ৮ শতাংশের ওপরে, সেখানে প্রাক্কলন করা হয়েছে অনেক নিচে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। অথচ সরকারের সামনে সুযোগ ছিল প্রকৃত বাস্তবতা স্বীকার করে ভিত্তি ঠিক করা। কারণ অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাজস্ব আহরণ ও অর্থায়নের ঝুঁকি
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা আদায় হবে না, এটি সবাই জানে। ফলে আগামী অর্থবছরে রাজস্বের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি করতে হবে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে এই সমীকরণ মেলানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ‘কম রাজস্ব, কম ব্যয়’- এই নীতিতে চলায় বাজেট ঘাটতি সীমার মধ্যে ছিল। কিন্তু এখন সরকার যদি ব্যয় বাড়াতে চায় এবং রাজস্ব আয় কম হয়, তবে ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ মারাত্মকভাবে বাড়বে। টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে গেলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মেগা প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও ঋণের ঝুঁকি
সিপিডি পর্যালোচনায় বলছে, বর্তমানে চলমান ৯৯৬টি বিনিয়োগ প্রকল্পের গড় বয়স ৫.৭ বছর। এর মধ্যে ৩২২টি প্রকল্পের বয়স ৬ থেকে ১০ বছর এবং ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলছে ৩৭টি প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়নে এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ৩৮.৬% যা আইএমএফের নিরাপদ সীমা (৪৫%) এর নিচেই আছে। তবে আইএমএফ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে ঋণ স্থায়িত্বের (উবনঃ ঝঁংঃধরহধনরষরঃু) ক্ষেত্রে ‘লো রিস্ক’ থেকে ‘মডারেট রিস্ক’ বা মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ ঋণের আসল ও সুদের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। ঋণ নিয়ে যদি সুশাসন ও স্বচ্ছতার সাথে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা না যায়, তবে অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
তিনি বলেন, ৫ থেকে ৬ বছর আগেও যেখানে বৈদেশিক ঋণ পরিষেবা (ডেট সার্ভিসিং) ছিল ৩ থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, এখন তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অনেক মেগা প্রকল্পের ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে এখন আসল ও সুদ উভয়ই পরিশোধের সময় শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট বা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্প থেকে আমাদের আয় হয় টাকায়, কিন্তু ঋণ শোধ করতে হয় ডলারে। বাজেটে টাকার মান ১২৬ থেকে ১২৭ টাকায় অবমূল্যায়নের যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তার ফলে ডলারের বিপরীতে ঋণের বোঝা আরো বাড়বে। কেবল সুদ নয়, আসল পরিশোধের হিসাবও বাজেটে গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব রয়েছে। আমরা যদি শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে না পারি, তবে কেবল শুল্ক ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ আনা যাবে না। অবকাঠামোগত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা একান্ত জরুরি। রাষ্ট্রকে এই সহায়ক ভূমিকা পালন করতেই হবে। কারণ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে কেবল নীতিগত সুবিধা দিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।



