- নদীতে লাশ ফেলার আগে ‘কমান্ডো নাইফ’ দিয়ে পেট চেরা হতো
- ইনজেকশন ও সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বুড়িগঙ্গায় লাশ ফেলা হয়
- জাফলং বর্ডারে ‘আসামি বদল’ ও ফেরার পথে দুইজনকে গুলি
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক জবানবন্দী দিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের এক সময়কার রানার ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। জবানবন্দীতে তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণ ও গুম করার পর জিয়াউল আহসানের সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর ফোনালাপের বিবরণ এবং র্যাবের অভিযানে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে হত্যার প্রত্যক্ষ বিবরণ তুলে ধরেছেন।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। বর্তমানে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত সাক্ষী ইমরুল কায়েস আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার পর নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেছেন।
ইলিয়াস আলী নিখোঁজ ও তারেক সিদ্দিকীর সাথে ফোনালাপ
আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে সাক্ষী ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১২ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে (১৩ এপ্রিল) জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ স্যার এবং স্কোয়াড্রন লিডার সাইফসহ তারা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে একটি অপারেশনের জন্য অবস্থান নেন এবং জিয়াউল আহসান টার্গেটের অবস্থান জানতে ফোনে যোগাযোগ করছিলেন। এর পরদিন তিনি ছুটিতে যান এবং গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পারেন যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়েছে।
২৩ এপ্রিল ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে তিনি র্যাব সদর দফতরে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করেন এবং জানতে পারেন যে অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল আহসান ধ্বংস করে ফেলেছেন। এছাড়া ১৮ এপ্রিল থেকে রোল কল সকাল ৯টার পরিবর্তে ৭টায় শুরু হয় এবং জিয়াউল আহসান নিজে সেখানে উপস্থিত থাকতেন।
সাক্ষী জবানবন্দীতে তৎকালীন ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানের একটি ফোনালাপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘জিয়া স্যারের রুমে থাকা অবস্থায় একদিন জিয়া স্যার ফোনে কোনো একজনের সাথে কথা বলছিলেন। ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল এলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন।’ জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপর প্রান্তে কী বলা হয়েছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ (হজম) করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে? এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠায়ে দেন, এটাই আমার ভালো।’
বস্তার ভেতর ঠাণ্ডা লাশ ও সাজানো অপারেশন
রানার হিসেবে যোগদানের ২০-২৫ দিন পরের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাক্ষী বলেন, এক রাতে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তিনি উত্তরায় র্যাব-১ এর সামনে যান এবং একটি কালো রঙের হাইয়েস মাইক্রোবাসে ওঠেন। সেখানে জিয়াউল আহসান, র্যাব-১ এর সিও রাশেদ স্যার এবং দলনেতা ক্যাপ্টেন কাউসার স্যারসহ অজ্ঞাত আরো দুইজন ছিলেন। গাড়িটি টঙ্গীর আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজ পার হয়ে একটি নির্জন রেল ক্রসিংয়ের পাশে থামে।
আদালতে সাক্ষী বলেন, ‘তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন যে, ‘ইমরুল ডিকিটা খুল, বস্তাটা বের কর’। আমি ডিকি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশ্যে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না, বরং একটা ডেড বডি ছিল এবং শরীরটা ঠাণ্ডা ছিল। প্রথম অবস্থায় আমি ভয় পেয়ে যাই। পরবর্তীতে অন্যদের সহায়তায় সেই লাশটি রেললাইনের ওপর রেখে আসা হয় এবং একটি ট্রেন তার ওপর দিয়ে চলে যায়।’ এই ঘটনার পর পাঁচ-সাত দিন তিনি মানসিকভাবে অস্বাভাবিক ও খাওয়া-দাওয়ায় অক্ষম ছিলেন। এছাড়া সুন্দরবনে জলদস্যু দমনের একটি অভিযানকে ‘সাজানো অপারেশন’ বলে দাবি করেন এই সাক্ষী, যেখানে জিয়াউল আহসান, র্যাবের এডিজি মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার উপস্থিতিতে দুই-তিনটি লাশ উদ্ধার দেখানো হয়েছিল।
বিডিআর বিদ্রোহ ও বুড়িগঙ্গায় লাশ গুমের নৃশংসতা
জবানবন্দীতে ইমরুল কায়েস উল্লেখ করেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ চলাকালে জিয়াউল আহসান ৮ থেকে ১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেন এবং জিয়াউল আহসান নিজেই তাকে বলেছিলেন যে এরা অফিসারদের হত্যা করেছে। এই হত্যাকাণ্ডগুলো দুইভাবে সম্পন্ন করা হতো- একটি হলো ইনজেকশন পুশ করে এবং অন্যটি পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নিয়ে গিয়ে। সেখানে মাথায় গুলি করে সিমেন্টের বস্তা রশি দিয়ে মৃতদেহের সাথে বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হতো।
২০১২ সালের শুরুতে একইভাবে তিনটি মাইক্রোবাসে করে ১১ জন আসামিকে পোস্তগোলা দিয়ে নদীতে নিয়ে জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং এডিজি মুজিব স্যারের উপস্থিতিতে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেয়া হয়। ওই সময় একজন আসামি নদীতে ঝাঁপ দিলে জিয়াউল আহসানের আদেশে সাক্ষী নিজে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে তাকে ধরেন বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন।
ক্রসফায়ার ও জাফলং বর্ডারে হত্যাকাণ্ড
২০১১ সালের রমজানের শেষে উত্তরা নর্থ টাওয়ারের সামনে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল দাবি করে চারজন লোককে এল ফায়ার দিয়ে হত্যার ঘটনাকে সাক্ষী ‘সাজানো অপারেশন’ বলে অভিহিত করেন।
এছাড়া ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে দুইজন হাত বাঁধা ও জমটুপি পরানো আসামিকে নিয়ে তারা জাফলং বর্ডারে যান। সেখানে ভারত থেকে সিভিল পোশাকে আসা চার-পাঁচজন লোক আরো দুইজন আসামি হস্তান্তর করে এবং এই পাশ থেকে দুইজনকে নিয়ে যায়। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুইজন আসামিকে নিয়ে ঢাকা ফেরার পথে জাফলং বর্ডার থেকে কিছু দূর আসার পর গাড়ি থেকে নামিয়ে দুইজনকে পৃথক দু’টি স্থানে জিয়াউল আহসান নিজেই গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন এবং সাক্ষীকে সামনে-পেছনে সিকিউরিটি হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
তিন মামার মোড়, কাঁচপুর ব্রিজ ও বলেশ্বর নদীর নৃশংসতা
এর কিছুদিন পর র্যাব-৪ এর সেফ হাউজ থেকে দুইজন আসামিকে নিয়ে যাওয়ার সময় ‘তিন মামার মোড়ে’ গাড়ি থামানো হয় (যা ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষী পরে সুনির্দিষ্ট করেন)। সেখানে গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামিয়ে জিয়াউল আহসান মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। সাক্ষী বলেন, ‘ওই আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সকলে হাসাহাসি করছিল।’ পরে গামছা খুলে নিয়ে তারা র্যাব-৪ এ ফিরে আসেন এবং অপর আসামিকে জিয়াউল আহসান নিজের সাথে নিয়ে যান।
এর এক-দুই সপ্তাহ পর কাঁচপুর ব্রিজের ওপর গাড়ি থামিয়ে দুইজন টার্গেটকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। জিয়াউল আহসান প্রথম টার্গেটকে এবং মেজর নওশাদ স্যার দ্বিতীয় টার্গেটকে গুলি করেন। ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেয়ার সময় লাশগুলোর লুঙ্গি খুলে দেয়া হয়।
এছাড়া সাক্ষী জিয়াউল আহসানের সাথে বেশ কয়েকবার বরিশালে যান। সেখানে র্যাব-৮ এর সহযোগিতায় পাথরঘাটার চরদুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীতে নিয়ে আসামিদের সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে টার্গেটগুলোর পেট ‘কমান্ডো নাইফ’ দিয়ে চিরে ফেলা হতো। সাক্ষী সুনির্দিষ্টভাবে জানান, পূর্ববর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরো ১০-১২ জন ব্যক্তিকে টিএফআই সেলের ভেতরে এবং গাড়ির মধ্যে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হয়েছে।
‘১৫০ থেকে ২০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে’
আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার একপর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী ইমরুল কায়েস। তিনি জবানবন্দীর শেষ অংশে বলেন, ‘আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি, তবে তা কখনই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে তার সাথে দেখেছি, তিনি ওই সময়কালে ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দী প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে কখনই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’
তিনি আরো জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং বর্তমানে তিনি রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। আদালতে সাক্ষ্য প্রদান শেষে তিনি নিজের ও পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর আবেদন জানান।
যেভাবে জিয়াউল আহসানের রানার পদে পদায়ন
২০০১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে আর্মার্ড কোরে যোগদান করেন ইমরুল কায়েস। চাকরির একটি পর্যায়ে ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন তিনি। পূর্বে পরিচয় থাকার সুবাদে তৎকালীন ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্স লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান তাকে নাম ও নম্বর দিতে বলেন। এর দুই-তিন দিন পরেই তার র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে পোস্টিং হয়। পরবর্তীতে মোহাম্মদপুর ক্যাম্পে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় তাকে ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্সের রানার বা বডিগার্ড হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
ইমরুল কায়েস জানান, রানার হিসেবে তার কাজ ছিল সার্বক্ষণিক জিয়াউল আহসানের সাথে থাকা। দায়িত্ব পালনকালে তিনি জিয়াউল আহসানের সাথে জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি হেডকোয়ার্টার্স, ডিবির প্রধান কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) এবং সচিবালয়ে যেতেন।
এছাড়া জিয়াউল আহসান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সিকিউরিটি চিফ অ্যাডভাইজার মেজর জেনারেল (অব:) তারেক সিদ্দিকীর বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং তাঁর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সাথেও সুসম্পর্ক ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার সময় জিয়াউল আহসানের গাড়ি হওয়ায় তা অস্ত্র-গোলাবারুদসহ থাকা সত্ত্বেও কোনো তল্লাশি করা হতো না। এছাড়াও তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাহবুবুল হক হানিফ, আমির হোসেন আমু এবং জাহাঙ্গীর কবীর নানকদের বাসাতেও জিয়াউল আহসান যেতেন এবং তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল বলে সাক্ষী উল্লেখ করেন।



