এনবিআর সূত্রে পাওয়া খবর অনুসারে, করের আওতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এবার খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রতি নজর দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পণ্য সরবরাহের পয়েন্টে ০.২০ শতাংশ নতুন উৎসে কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বছরে অন্তত ৬ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত উৎসে কর আরোপের এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকার মূলত খুচরা অর্থনীতির বিশাল অনানুষ্ঠানিক অংশকে করের আওতায় আনতে চাইছে, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী কার্যত আয়কর নেটওয়ার্কের বাইরে রয়ে গেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য- সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কর পরিপালন বাড়ানো।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কর সংগ্রহের দায়িত্ব সরাসরি খুচরা বিক্রেতার ওপর না দিয়ে ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের ওপর চাপানো হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো দোকানদার যখন পণ্য কিনবেন, তখন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা ডিলার উৎসে কর কেটে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবে। সরকারের ধারণা, সরাসরি লাখ লাখ ছোট দোকানিকে ধরার চেয়ে সাপ্লাই চেইনভিত্তিক কর আদায় তুলনামূলক সহজ ও কার্যকর হবে।
তবে বাস্তবতায় এই পদ্ধতি বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের খুচরা বাজার অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও অনানুষ্ঠানিক। অসংখ্য ছোট দোকানির টিআইএন নেই, হিসাবরক্ষণ নেই, এমনকি ডিজিটাল রেকর্ডও নেই। ফলে ডিলারদের ওপর কর সংগ্রহ, তথ্য সংরক্ষণ, মোবাইল ট্র্যাকিং ও রিপোর্টিংয়ের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। বড় কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই আশঙ্কা করছে, এতে তাদের অপারেশনাল ব্যয় বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো- শেষ পর্যন্ত এই করের বোঝা কে বহন করবে? সাধারণভাবে প্রত্যক্ষ কর বহন করতে হয় করদাতাকে। কিন্তু এ ধরনের অগ্রিম আয়করের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যবসায়ীরা সাধারণত অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করেন। ফলে এফএমসিজি, খাদ্যপণ্য, সিমেন্ট, স্টিল, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। যদিও এনবিআর বলছে করের হার খুব কম এবং রিফান্ডের সুযোগ থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের কর প্রশাসনে রিফান্ড প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য তা বাস্তবে কার্যকর যে হবে না সেটি বলাই যায়।
খুচরা বিক্রেতাদের ওপর ০.২০ শতাংশ উৎসে কর আরোপের প্রস্তাবটি সরকারের কাছে রাজস্ব বাড়ানোর একটি ‘কমপ্লায়েন্স টুল’ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, এর সমালোচনার জায়গা অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক এই চারটি স্তরে বিস্তৃত। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি শুধু একটি কর নীতি নয়; বরং বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক গণমানুষের অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির একটি বড় পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো- সরকার কর প্রশাসনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার বদলে সহজ লক্ষ্য হিসেবে ক্ষুদ্র খুচরা ব্যবসায়ীদের বেছে নিচ্ছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বড় কর ফাঁকিদাতা, উচ্চ আয়ের অপ্রদর্শিত সম্পদ, কালো টাকা, আন্ডার-ইনভয়েসিং, ট্রান্সফার প্রাইসিং কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কর অব্যাহতির মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার এমন একটি খাতকে টার্গেট করছে, যেখানে অধিকাংশ ব্যবসায়ী ছোট পরিসরের এবং প্রশাসনিকভাবে দুর্বল। এটি হলো ‘লো-রিস্ক ট্যাক্সেশন’- অর্থাৎ যাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ওপর করের চাপ বাড়ানো।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থাটি মূলত ‘প্রিজাম্পটিভ ট্যাক্সেশন’ বা আগাম কর আদায়ের একটি রূপ, যেখানে প্রকৃত আয় বিবেচনা না করেই কর কেটে নেয়া হবে। ফলে একজন ছোট দোকানি লাভ করুক বা ক্ষতিতে থাকুক- পণ্য কিনলেই তার নামে কর জমা হবে। বাস্তবে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় অংশ নগদ প্রবাহ সঙ্কটে থাকে। তাদের জন্য প্রতিটি অতিরিক্ত কর্তন কার্যত কার্যকর মূলধন কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ সরকার ব্যবসায়ীর প্রকৃত আয় নয়, তার লেনদেনকেই করযোগ্য ধরে নিচ্ছে। এটি কর ন্যায্যতার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে হবে। আয় এবং লেনদেন কোনোভাবেই এক নয়। লেনদেন আয় বাড়াতেও পারে আবার ক্ষেত্র বিশেষে কমাতেও পারে। লেনদেনের ওপর আয়কর আরোপের যুক্তি থাকতে পারে না।
তৃতীয়ত, এই নীতি করব্যবস্থাকে আরো জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট করতে পারে। বর্তমানে কোম্পানি, ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন করকাঠামো বিদ্যমান। তার ওপর নতুন উৎসে কর যুক্ত হলে ‘মাল্টিপল ট্যাক্স ইনসিডেন্স’ তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, একই পণ্যের ওপর বিভিন্ন ধাপে করের প্রভাব যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপবে। অর্থাৎ সরকার বললেও যে দাম বাড়বে না, বাস্তব বাজার কাঠামোতে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় ও ক্যাশ-ফ্লো সঙ্কট পণ্যের দামে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। চতুর্থত, এই ব্যবস্থার মধ্যে একটি ‘ডিজিটাল নজরদারি রাষ্ট্র’ তৈরির আশঙ্কার বিষয়টিও উঠে আসছে। সরকার মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতাদের ট্র্যাক করবে, এসএমএসের মাধ্যমে কর তথ্য পাঠাবে এবং ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশের তথ্য সুরক্ষা কাঠামো কতটা শক্তিশালী? ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক তথ্য ভবিষ্যতে হয়রানি, অনিয়মিত জরিমানা বা প্রশাসনিক চাপের হাতিয়ার হবে না- তার নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ বহু পুরনো। ফলে ডিজিটালাইজেশন স্বচ্ছতা আনবে নাকি নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পঞ্চমত, এই নীতির মাধ্যমে সরকার মূলত করব্যবস্থার দায়িত্ব বেসরকারি সরবরাহ চেইনের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজে কর সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে ডিস্ট্রিবিউটরদের ‘অনানুষ্ঠানিক ট্যাক্স কালেক্টর’-এ পরিণত করছে। বড় কোম্পানিগুলো বলছে, এতে তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়বে, সফটওয়্যার, রেকর্ড ব্যবস্থাপনা, কর্মী এবং অডিট ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ছোট ডিস্ট্রিবিউটরদের বাজার থেকে ছিটকে দিতে পারে এবং বড় করপোরেট বিতরণ নেটওয়ার্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
ষষ্ঠত, এই নীতির রাজনৈতিক অর্থও রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি দুর্বল হলেও মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি মূল্য, ভ্যাট এবং আমদানি ব্যয়ের কারণে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ইতোমধ্যেই চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের নতুন করের আওতায় আনা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত। কারণ এই শ্রেণিটিই স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সামাজিক ভিত্তির অংশ। ফলে বাস্তবায়নের সময় প্রতিরোধ, অসন্তোষ কিংবা অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিকল্প চ্যানেল তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
সবশেষে, একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো- সরকারের লক্ষ্য কি সত্যিই কর ন্যায্যতা, নাকি দ্রুত রাজস্ব সংগ্রহ? কারণ বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, শুধুমাত্র নতুন কর আরোপ করে নয়; বরং কর প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা, সুশাসন, বড় কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতাদের আস্থা তৈরি ছাড়া টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অন্যথায় এই ধরনের পদক্ষেপ অর্থনীতিকে আরো অনানুষ্ঠানিক করে তুলতে পারে, যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কর এড়াতে নগদ লেনদেন ও অঘোষিত সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে আরো বেশি ঝুঁকে পড়বেন।



