নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
বাসায় অবস্থান করলেও ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে বন্দুকযুদ্ধের নাটকে গুলি করার পর পুলিশেরই সাজানো মামলায় নিজের নাম ‘আহত’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। যশোরের চৌগাছায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি আদালতকে জানান, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে ভিন্ন মতাবলম্বীদের গুলি করে পঙ্গু করেছিল, আর সেই বিবেকের তাড়না থেকেই তিনি ট্রাইব্যুনালে সত্য প্রকাশ করতে এসেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে উপস্থিত হয়ে এএসআই পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন। নিরাপত্তার স্বার্থে আদালতের নির্দেশে ৫১ বছর বয়সী এই সাক্ষীর নাম প্রকাশ করা হয়নি। ২০১৬ সালে ঘটনার সময় তিনি চৌগাছা থানায় কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানায় কর্মরত রয়েছেন।
জবানবন্দীতে ওই এএসআই জানান, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট বিকেলে চৌগাছার নারায়ণপুর এলাকায় একটি চেকপোস্ট থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই নেতা ইসরাফিল ও রুহুল আমিনকে আটক করা হয়। পরে তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানের নির্দেশে তাদের থানায় এনে ডিউটি অফিসারের কক্ষে রাখা হয়। আটকের পর নিজের কাজ শেষ করে ওই পুলিশ সদস্য থানায় থাকা নিজ ভাড়া বাসায় চলে যান। পরদিন ৪ আগস্ট তার কোনো ডিউটি ছিল না।
কিন্তু ৫ আগস্ট সকালে থানায় গিয়ে তিনি জানতে পারেন, আটককৃত দুই নেতাকে ৪ আগস্ট বন্দুলিতলা এলাকায় নিয়ে পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করেছেন কনস্টেবল সাজ্জাদুর ও জহরুল। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এসআই মোখলেছ বাদি হয়ে ওই দু’জনের বিরুদ্ধে দু’টি মিথ্যা বন্দুকযুদ্ধের মামলা করেন।
চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সেই সাজানো মামলায় ওই এএসআইকে আসামিদের হামলায় ‘আহত সঙ্গীয় কর্মকর্তা’ হিসেবে দেখানো হয় এবং দাবি করা হয় তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। জবানবন্দীতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন এবং তিনি বিন্দুমাত্র আহত হননি। এ বিষয়ে এসআই মোখলেছকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, তৎকালীন জেলা এসপি আনিসুর রহমান ও ওসি মশিউর রহমান সব জানেন এবং তাকে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়। পরে তাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই ভুয়া মামলার চার্জশিটে সাক্ষী করা হয়।
আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় এই কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তৎকালীন সময়ে যশোর জেলাতেই সরকারের বিরোধিতা করার কারণে প্রায় অর্ধশত তরুণকে গুলি করে পঙ্গু করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে যেন কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে এভাবে ব্যবহার করা না যায়, সেজন্য জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
জবানবন্দী গ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনজুর আলম সাক্ষীকে জেরা করেন। তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ এই মামলার মোট আটজন আসামির মধ্যে গ্রেফতার হওয়া চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পলাতক রয়েছেন বাকি পাঁচ আসামি। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা।



