নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তিকে সাধারণ কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের একতরফা ‘হুকুমনামা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-সবুজ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেন, এ চুক্তিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বাণিজ্যচুক্তি বলা চলে না। এটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের একটি নির্দেশনামা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কী কী করতে বাধ্য থাকবে, তা একতরফাভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি। ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি: হুমকিতে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মের কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ সাধারণত সেখান থেকেই পণ্য আমদানি করে, যেখানে কম দামে ও ভালো মানের পণ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কম আমদানি করে থাকে, কারণ মার্কিন পণ্য তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ এ চুক্তিতে ঘাটতি বাণিজ্যের খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং আত্মঘাতী। এ চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বীকৃত কোনো নীতিমালার প্রতিফলন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। চুক্তি স্বাক্ষরের সময়কাল নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বিশ্বের বেশির ভাগ বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও দেশ যখন এ ধরনের একপেশে চুক্তি এড়িয়ে গেছে বা সর্বোচ্চ আলোচনার স্তরে রেখেছে, তখন বাংলাদেশ কেন স্বেচ্ছায় আগ বাড়িয়ে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করল? একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে নিজেদের গরজে ও রহস্যজনক আগ্রহে এ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
চুক্তির সম্ভাব্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম, তুলা, মাছ কিংবা মাংস আমদানি করতে হবে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আয় কমবে, অন্যদিকে আমদানিকৃত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে। আর সেই ভর্তুকির চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ঘাড়েই এসে চাপবে। শুধু তাই নয়, দেশের বিকাশমান ওষুধশিল্প, ডেইরি শিল্প, আইটি ও ই-কমার্স খাত এবং আমাদের জাতীয় গ্যাস-সম্পদ—সবকিছুই এই অসম চুক্তির আওতায় চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি চুক্তির মূল ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপট ও ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশকে এই চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে মার্কিন আদালত নিজেই তা বাতিল করে দিয়েছে।
নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি এই বিতর্কিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। আর তার ঠিক কয়েকদিন পর, অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আদালত ওই অতিরিক্ত শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকার যদি অল্প কয়েকটা দিন অপেক্ষা করত, তবে এই অসম ও দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির কোনো প্রয়োজনই পড়ত না। এর থেকেই প্রমাণিত হয়, চুক্তিটি কতটা একপক্ষীয়, তাড়াহুড়ো করে করা এবং জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি। বক্তারা অবিলম্বে এ জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন অথবা বাতিলের দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে সম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধ বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। তা হলো- ১. সংবিধানের ১৪৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করে চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া, একই সঙ্গে দেশ বিক্রির গোলামি চুক্তির সঙ্গে জড়িত ড. ইউনূস, ড. খলিলুর রহমানসহ সকলকে বিচারের আওতায় আনা। ২. অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কার্যক্রমের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা;
৩. বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ করে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করতে হবে। ৪. নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়াল্ড বা কোনো বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া পাঁয়তারা বন্ধ কর। লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিল করা।
৫. দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি জিএসওএমআইএ, এসিএসএর নামে বাংলাদেশের বন্দর, বিমান ঘাটি মার্কিনীদের ব্যবহার করতে দেওয়ার পাঁয়তারা বন্ধ করা। বাংলাদেশেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘাটি করতে দেওয়া হবে না।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন, বাসদ মার্ক্সবাদী সমন্বয়ক মাসুদ রানা, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কাফি রতন, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির মোশরেফা মিশু, চর্চা সম্পাদক সোহরাব হোসেন প্রমুখ।



